রাখাইনের রোহিঙ্গারা আসছে : বসতি বাড়ছে

9987655.jpg

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া |
সীমান্তরক্ষী বিজিবি’র কড়া নজরদারি থাকার পরও রাতের আধাঁরে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে স্ব-পরিবারে। স্থানীয় দালালরা টাকার বিনিময়ে এসব রোহিঙ্গাদের পৌঁছে দিচ্ছে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে। প্রতি রাতে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকলেও তাদের থাকার কোন জায়গা নেই। ফলে এসব রোহিঙ্গারা রাত যাপনের জন্য তৈরি করছে নতুন নতুন ঝুঁপড়ি ঘর। গতকাল বৃহস্পতিবার কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
কুতুপালং বস্তির বাসিন্দা ইয়াকুব আলী জানান, ছোট্ট একটি ঝুঁপড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী ছেলে মেয়েসহ ৭ জনের বসবাস। এমতাবস্থায় আত্মীয় হিসেবে এক পরিবারের ৫ জনকে জায়গা দিতে গিয়ে কোন রকমে ঠাসাঠাসির মধ্যে রাত কাটাতে হচ্ছে। এভাবে আরো বেশ কয়েকজন বস্তির বাসিন্দা নতুন রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে গিয়ে কষ্টের কথা সাংবাদিকদের কাছে জানালেন।
রোহিঙ্গা বস্তির বি-ব্লকের পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পলিথিনের ঘেরাবেড়া ও ছাউনি নিয়ে ৪/৫টি নতুন ঝুঁপড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। মিয়ানমারের খেয়ারীপাড়া থেকে আসা মৃত শরিফ হোসেনের ছেলে আবুল, জসিম জানায়, তারা স্বামী-স্ত্রীসহ ৬ জনের একটি পরিবার অস্থায়ী ভাবে স্থানীয় আব্দুল হামিদের নিকট থেকে টাকা দিয়ে একটি ঝুঁপড়ি বাধাঁর অনুমতি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
মংডু নাইছংপাড়ার জাফর আলম (৪০) জানায়, সে স্থানীয় সিরাজ সওদাগরের নিকট থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি ঝুঁপড়ি বাধাঁর জায়গা নিয়েছেন। ক্যাম্পের বাজার থেকে পলিথিন, বাঁশ ক্রয় করে একটি ঝুঁপড়িঘর নির্মাণ করেছি। এভাবে আরো বেশ কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নাগরিক নতুন করে ঝুঁপড়ি নির্মাণের কথা জানালেন।
গত ১১ নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের মগ সেনা পুলিশ ও রাখাইন সম্প্রদায়ের ত্রিমুখী নির্যাতনের শিকার হয়ে মংন্ডু রাখাইন রাজ্য এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গারা এপারে চলে আসছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ও কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার সত্যতা স্বীকার করে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার আরো ১৫ পরিবারের প্রায় শতাধিক রোহিঙ্গাসহ প্রায় ১১ হাজার রোহিঙ্গা দু’ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। সে জানায়, আত্মীয়তা ও পূর্ব পরিচিতির সুবাধে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তাদেরকে শীত বস্ত্র বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিধায় এসব রোহিঙ্গারা শীত নিবারণ সহ নানা সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর রাতে ৭ দিনের শিশু ইব্রাহিম, মোহাম্মদ তৈয়ব (২), মোহাম্মদ তাহের (৩) সন্তান নিয়ে মংন্ডুর খেয়ারীপাড়া থেকে এসেছেন হুমায়রা বেগম (৩৫)। তার এখানে কোন আত্মীয় স্বজন নেই। যদি কেউ আশ্রয় দেয় সেখানে কোন ভাবে রাতযাপন করতে পারব। সে জানায়, মগসেনাদের অত্যাচার, জুলুম নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনটি শিশু নিয়ে উনচিপ্রাং সীমান্ত দিয়ে দালালের মাধ্যমে কুতুপালং বস্তিতে এসেছি। সে আক্ষেপ করে বলেন, আমার তিনটি শিশুকে বাচাঁতে পেরে শান্তি পাচ্ছি।
বয়োবৃদ্ধ নুর বেগমের (৫৫) হাত ধরে এসেছেন আছিয়া খাতুন(২৫) নামের এক অন্ধপ্রতিবন্ধী। তার এক ছেলে মোহাম্মদ কামাল (৫) সে ও চোখে দেখে না। নুর বেগম জানায়, আছিয়ার স্বামীকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আর কোন খোঁজ মিলেনি। আমি অন্ধ পুত্র বধু ও অন্ধ নাতি নিয়ে দালালের মাধ্যমে কুতুপালং বস্তিতে এসেছি। আমি এখন এদের নিয়ে কোথায় উঠবো জানিনা। টাকা পয়সা আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে আছিয়া খাতুন জানান, আসার সময় কিছু টাকা এনেছি। তা নৌকার ভাড়া আর দালালেরা ভাগাভাগি করে ওই টাকা নিয়ে গেছে।
বস্তির এনায়েত উল্লাহ নামের এক বাসিন্দা জানায়, বস্তির প্রতিটি বাড়ীতে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তারা এমনিতে অসহায় তার উপর শীতবস্ত্র না থাকার কারণে কষ্ট পাচ্ছে। সে আরো জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার যে সমস্ত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এসেছে তারা কোথায় থাকবে বলতে পারছি না।
কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, যাদের টাকা আছে তারা ঝুঁপড়ি নির্মাণ করছে। যাদের সহায় সম্বল নাই তারা অন্যের বাড়ীতে মানবেতর দিনযাপন করছে।
কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ আরমান শাকিল জানান, তার ক্যাম্পে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নাগরিক আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। বস্তিতে আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বস্তির ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর রাখেন না। যেহেতু বস্তি এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে নয়।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, বিজিবি’র পাশাপাশি পুলিশ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে রাতদিন পরিশ্রম করছে। তথাপিয় ফাঁকফোকর দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, সীমান্তে বিজিবি’র কড়া নজরদারি সত্ত্বেও যেসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে তাদেরকে আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি নাফনদী অতিক্রম করা কালেও রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে।