মিয়ানমারে মগ সেনাদের নির্যাতন থেমে নেই : রোহিঙ্গাদের কান্না থামাবে কে?

Rohingha-pic_lada-taal_29.11.jpg

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি |
মিয়ানমারের মংন্ডু আরাকান রাজ্যের মগ সেনাদের দমন পীড়ন, অত্যাচার জুুলুম নিত্য দিনের কর্মকান্ডে পরিণত হয়েছে। গত ২ দিন ধরে সীমান্ত এলাকার ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার, পোয়াখালী, নোয়াখালী ও নাগপুরা সহ ৫টি গ্রামে মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা তান্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের সহায় সম্পত্তি তাদের হেফাজতে নিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে রাতের আধাঁরে চলে আসার জন্য হাজারো অধিক রোহিঙ্গা সীমান্তের কুমিরখালী গহীন পাহাড়ে অপেক্ষা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার ভোররাতে প্রায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে বলে ক্যাম্প সূত্রে জানা যায়।
রেজু বিজিবি’র নায়েব সুবেদার নুরুল আমিন বলেন, দুটি টমটম ও একটি ছাড়পোকা ভর্তি প্রায় ৩৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিক মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে তাদের আটক করে বালুখালী বিজিবি’র নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের সহায়তা করার দায়ে টেকনাফের মোহাম্মদ আমিন (৩০), মোহাম্মদ ইব্রাহিম (৩২), মোহাম্মদ সেলিম (২০) ও উসমান (১৬)সহ ৪ জন দালালকে আটক করে উখিয়া থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দা মোহাম্মদ তারেক(৪৫) জানান, গত সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার ভোর সকালে প্রায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। সে জানায়, ২টি শরণার্থী ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সে আরো জানায়, বেশির ভাগ রোহিঙ্গা সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে জানা যায়, মগ সেনারা মংন্ডু নেম্রে, ৪নং কুমিরখালী পাড়ার পূর্ব পার্শ্বে হারাইঙ্গাঘোনা, তুলাতলী, লম্বাবিল গ্রামে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে ২ জন রোহিঙ্গা যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে ওই গ্রামের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হারাইঙ্গাঘোনা থেকে আসা মোহাম্মদ রফিক (২৪) জানায়, মগ সেনা, পুলিশ ও রাখাইনরা ফের গ্রামে হামলা করতে পারে এ আশংকায় ঘরবাড়ি ছেড়ে হাজারেরও অধিক নারী-পুরুষ-শিশু কুমিরখালীর সীমান্তে জড়ো হয়েছে। এপারে বিজিবি’র কঠোর নিরাপত্তার কারণে চলে আসতে না পারলেও যে কোন সময় রাতের আধাঁরে চলে আসতে পারে।
নাগপুরা থেকে পালিয়ে আসা আব্দুল গফুর (৪০) জানায়, গত ২ দিন ধরে মগসেনারা সীমান্তের ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার ও নাগপুরা সহ ৫টি গ্রামে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। পুড়িয়ে দিয়েছে ধানের খামার। এসময় মগসেনারা বাড়ীতে ঢুকে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর যুবতী মেয়েদের ধর্ষণ করছে।
সে জানায়, সীমান্ত এলাকার পাড়া গুলোতে ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়া আগুনের লেলিহান শিখা এপারের অনেকেই দেখেছে। এসময় বয়োবৃদ্ধ মরিয়ম খাতুন (৫৫) জানায়, তার ছেলে ইমাম শরীফ (২৮) ও তার পুত্র বধু মনোয়ারা (২২) ৩ জনের সংসার তছনছ করে দিয়েছে মগসেনারা।
সে কান্না জড়িত কণ্ঠে জানায়, গত সোমবার রাতে ভাত খেয়ে তারা ঘুমাচ্ছিল। এসময় হঠাৎ মগসেনারা ঘরে আগুন দিলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। এসময় মগসেনারা তার ছেলে ইমাম শরীফকে ধরে নিয়ে গেছে। ছেলের বউকে নিয়ে কোন রকম পাড়া প্রতিবেশীর সাথে পালিয়ে এসেছি। এভাবে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নাগরিক তাদের হৃদয় বিদারক ঘটনা জানিয়েছেন।
মিয়ানমারের গৌজবিলের রহিমুল্লাহ (২২) জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী গ্রামে এসে আগুন দেয় এবং হেলিকাপ্টার থেকে গুলি বর্ষণ করে। এতে কতজন হতাহত হয়েছে তা তার জানা নেই। তবে তার শরীরের বেশ কয়েকটি স্থানে গুলি লেগেছে বলে জানায়।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে নাফ নদীতে যে সব নৌকা রয়েছে ওইসব নৌকার মাঝিদের দায়ী করে বলেন, তাদের কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে পারছে। তাই এসব নৌকার মাঝিদের তালিকা করার নির্দেশ দিয়ে পুলিশ ও বিজিবি’র প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, স্থায়ী কিছু যানবাহন শ্রমিক রোহিঙ্গাদের সু-নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে সহযোগীতা করছে। ওইসব শ্রমিকদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সভায় নির্দেশ দেওয়া হয়।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার সাংবাদিকদের জানান, অনুপ্রবেশকারী ৩৪ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের সহায়তা করা দায়ে ৪ জন দালালকে উখিয়া থানা পুলিশের নিকট সোর্পদ্দ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সীমান্তে ও সড়কে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।