সীমান্তে বিজিবি’র কঠোর নিরাপত্তা : থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ

DSC_4811-copy.jpg

ফাইল ছবি

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া ॥
মিয়ানমারের মংন্ডু রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর দমন, নিপীড়ন, অব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়হীন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এপারে চলে আসার জন্য সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে উৎপেতে অপেক্ষা করছে। এপারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি’র কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকার পরও থেমে নেই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। গত ২ সপ্তাহে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন রোহিঙ্গা বস্তিতে কমপক্ষে ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু আশ্রয় নিয়ে নিয়েছে বলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে।
গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের মংন্ডুর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩টি সেনা ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলায় ৯ জন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাখাইন জনগোষ্ঠি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত ফয়সাল আনোয়ার জানান, ১১ নভেম্বর হতে এ পর্যন্ত মংন্ডুর নাইচাপ্রু, হাস্যেরপাড়া, সাতগরিয়া পাড়া, খেয়ারীপ্রাং, ওয়াবেক, নাকপুরা, লোদাইং, কাউয়ারবিল, ধুংছেপাড়া, বড় গৌজবিল, ছোট গৌজবিলসহ প্রায় ১৮টি গ্রামে লুটপাট, ধর্ষণ, খুন, নির্যাতন চালিয়ে ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
পুরুষদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আর বহু নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করছে সেনারা। মিয়ানমার থেকে এদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীরা জানিয়েছে সেই সব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা তরুণী রুবাইয়া(২৪) জানিয়েছেন, ‘বিছানার সঙ্গে ওরা তাদের দুই বোনকে বেঁধে রেখেছিল। এরপর এক এক করে সেনা এসে তাদের ধর্ষণ করেছে।’
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এলেও সেই আতঙ্ক এখনও তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেনাদের অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল ওই তরুণীর মুখ। পাশে বসে ছিল তার আরো দুই ভাই-বোন, তারাও সেনাদের অত্যাচারের সাক্ষী। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসাদের অধিকাংশই আশ্রয় নিয়েছে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে। রুবাইয়ার ছোট ভাই আব্দুল হাসেম জানিয়েছে, সেখানে তাদের ঠিক মত খেতেও পারেনি। বহুদিন তাদের উপবাসে কাটাতে হয়েছে।
দুই বোনের সঙ্গে প্রাণ হাতে করে সীমান্ত পেরিয়ে কুতুপালং বস্তিতে এসেছে আব্দুল হাসেম। এখানে অন্তত কেউ তাদের খুন করার চেষ্টা করবে না বা শারীরিকভাবে অত্যাচার করবে না ভেবে যেন কিছু স্বস্তি পাচ্ছে তারা। রুবাইয়ার ছোট বোন সাবিহার বয়স(১৭)। মিয়ানমারের কাউয়ারবিল গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। সেখানে হানা দেয় সেনা সদস্যরা। দুই বোনকে পালাক্রমে ধর্ষণের পর তাদের ঘরে আগুন দিয়ে চলে যায় সেনারা। এর আগেই তাদের বাবাকে হত্যা করা হয়।
শুধু রুবাইয়া বা সাবিহারাই নয়। এই দুই বোনের মতো প্রতিদিন আরো অনেক রোহিঙ্গা কিশোরী-যুবতী ধর্ষিত হচ্ছে। বাধা দেয়া হলে তাদের নৃশংসভাবে মেরে ফেলে চলে যাচ্ছে সেনারা। যাওয়ার সময় বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। রুবাইয়া জানালো, পালিয়ে না এসে উপায়ও ছিল না। সেনারা চলে যাওয়ার আগে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল এরপর আবার তাদের দেখতে পেলে খুন করা হবে। তারা যেন পালাতে বাধ্য হয় সেজন্যই তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়াতেই সেনারা তাদের উপর শারীরিক অত্যাচার চালাচ্ছে, গণহারে ধর্ষণ করছে। এমন একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যেন উদ্বাস্তুরা ভয়ে পালিয়ে যায়।
এসব গ্রামের মানুষগুলো সশস্ত্র সেনা সদস্যের নিমর্ম নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষার জন্য পাহাড় জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এগোচ্ছে। কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া খেয়ারীপ্রাং গ্রামের আলী আহমদ (৬৫) জানান, তার পরিবারের স্ত্রী, পুত্র সহ ৭ সদস্যের মধ্যে ৬ জনের কোন খোঁজ খবর না পেয়ে তিনি একাই ৩দিন পায়ে হেঁটে উনচিপ্রাং সীমান্ত দিয়ে বস্তিতে চলে আসে। সে জানায়, তার মতো হাজার হাজার রোহিঙ্গা এদেশে আসার জন্য সীমান্তে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
গতকাল রোববার সকালে থাইংখালী থেকে কুতুপালং ঘুরে দেখা যায়, বিজিবি সদস্যরা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোষ্ট বসিয়ে যাত্রীবাহি গাড়ীগুলো তল্লাশী চালিয়ে দেখছে রোহিঙ্গা আছে কিনা। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, বিজিবি-পুলিশের সর্তক অবস্থানের পরও প্রতিদিন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা কুতুপালং বস্তি ও শরণার্থী শিবিরে ঢুকছে। সে জানায়, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু এখানে আশ্রয় নিয়েছে।
সে আরো জানায়, এসব রোহিঙ্গারা এক কাপড়ে চলে আসার কারণে প্রচন্ড শীতের রাতে অমানবিক সময় পার করছে। আশ্রীতা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা কারো না কারো আতœীয় স্বজন হওয়ার সুবাদে তাদের অনুপ্রবেশের খবর অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ শাকিল আরমান জানিয়েছেন। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের পাশাপাশি এখানকার বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ পল্লীতে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের কড়া নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কমেছে। তবে রাতের আধাঁরে সীমান্তের বিভিন্ন ফাঁক ফোকড় দিয়ে কিছু কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে বলে শুনা যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, গতকাল রোববার ৫ জন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।