মিয়ানমারের আরাকানে বিপন্ন মানবতা : বিশ্ব বিবেক নীরব

7777-1.jpg

SAMSUNG CAMERA PICTURES

৪৪৩ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া |
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমনে পুরো বিশ্ববাসী যখন তৎপর, ঠিক তখনই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সীমান্তরক্ষী (বিজিপি) নির্মমতা, নৃসংশতায় মরছে রোহিঙ্গারা, বিপন্ন হচ্ছে মানবতা। সবুজ প্রকৃতি পুড়ে বিবর্ণ হচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে তরুণ-তরুণী, শিশু-বৃদ্ধ। তবুও বিশ্ব বিবেক নাড়া দিচ্ছে না। সীমান্তে বিজিবি’র কড়া নজরদারি ভেদ করে রাতের আধাঁরে প্রতিনিয়ত অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গা নারী-পুুরুষ-শিশু। তারা আশ্রয় নিচ্ছে কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন রোহিঙ্গা বস্তিতে। গতকাল শুক্রবার ৩৪ জন রোহিঙ্গাসহ এ পর্যন্ত ৪৪৩ জন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
মিয়ানমারের সশস্ত্র সেনা সদস্য ও সীমান্তরক্ষী বিজিপির নিষ্ঠুরতা মরণ চোবল থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসছে গত ১১ নভেম্বর থেকে। তাদের অনেকেই স্বামী হারা, কেউ বা মা-ছেলে সন্তান হারা। এদের মধ্যে গতকাল শুক্রবার ভোর সকালে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া মংন্ডু জামবুনিয়া রাঙ্গাবালি গ্রামের স্বামী হারা বিমূর্ষ হতবাক জরিনা খাতুন (৫৫) জানায়, রাতের আধাঁরে সেনা সদস্যরা অর্তকিত ভাবে তাদের গ্রামে এসে বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়। এসময় প্রাণ বাচাঁতে কে কোথায় গেছে তার জানা নেই। তবে নূর ফাতেমা (৭), সাহেনা (৬) ও হাসিনা (৫) সহ তিনজন নাতী নিয়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। পরে ঝিম্মংখালী সীমান্ত পথধরে কোন রকম এপারে চলে আসে। সে আরো জানায়, মোহাম্মদ শাহ আলম (১৭), নুর সালাম (১৫), হামিদ হোছন (১২), আমান উল্লাহ (১০) সহ ৪ ছেলে কোথায় গেছে খোঁজ খবর পায়নি।
গতকাল শুক্রবার সকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে জানা যায়, ১০ পরিবারের প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। মংন্ডু পোয়াখারী নয়াপাড়া থেকে আসা মোহাম্মদ ইউনুছ (২৫) জানায়, তারা রাতে ভাত খাওয়ার সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রামে ঢুকে গুলি বর্ষণ করে বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়। এসময় বাড়ির বাইরে এসে দেখা যায়, মানুষ ছুটাছুটি করে পালাচ্ছে। সেও তার স্ত্রী তসলিমা (২২) ২ সন্তান মোহাম্মদ ইদ্রিস (৪) ও হাবিবা (৩) কে নিয়ে পার্শ্ববর্তী ধান ক্ষেতে লুকিয়ে পড়ে। পরদিন রাতের আধাঁরে টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া ঘাট দিয়ে এদেশে চলে আসে। সে জানায়, নাফনদীর পার হওয়ার সময় নৌকা ওয়ালা জনপ্রতি ত্রিশ হাজার (কিয়াত) ভাড়া আদায় করেছে।
মিয়ানমারের মংন্ডু খেয়ারীপাড়া গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আলি আহমদ (৬০) জানায়, তাদের পাড়াটি জ্বালিয়ে দেওয়ার কারণে তারা পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানেও সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে গ্রামটি জ্বালিয়ে দিলে সে পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও তার পরিবারের ৭ সদস্যের কোন খোঁজ খবর পাননি। একই এলাকার আব্দুল হামিদ (২৬) জানায়, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বিজিপির সদস্যরা বাড়ী বাড়ী গিয়ে পুরুষদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর যুবতী নারীদের ধর্ষন করছে। সে প্রাণ বাচাঁতে কোন রকমে পায়ে হেঁেট হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে এপারে চলে এসেছে। তবে তার পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েসহ তার স্ত্রী ছেনুয়ারা কোথায় কিভাবে দিন কাটাচ্ছে তার জানা নেই।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্পে ঢুকতে না পারে সেজন্য ক্যাম্পের বাইরে সার্বক্ষণিক পুলিশের সর্তক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ব্যাপারে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ রোধে চেষ্টা করা হচ্ছে এবং বিজিবি’র চোখ ফাঁকি দিয়ে যে সব রোহিঙ্গা রাতের আধাঁরে অনুপ্রবেশ করেছে তাদের আটক করে পুশব্যাক করা হচ্ছে।