প্রাণের মায়ায় সীমান্ত পারের ঝুঁকি নিচ্ছেন রোহিঙ্গারা

15151028_942082012603328_701314561_n.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চলছে। দেশটির সেনাবাহিনীর গুলিতে এবং রাখাইন যুবকদের ধারালো অস্ত্রে খুন হচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত এ জাতিগোষ্ঠীর বহু লোকজন।

হত্যার পাশাপাশি যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তরুণী ও মাঝবয়সী নারীরা। নৃশংসতার হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিবৃতিতে মিয়ানমারের এ সহিংস পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের করুণ অবস্থা উঠে আসছে।

জাতিগত নিপীড়নের শিকার অনেক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের সীমান্ত পারের ঝুঁকি নিচ্ছে। বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার সর্বাত্মক চেষ্টায় রয়েছেন আতংকিত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গাদের সীমান্ত অতিক্রম ঠেকাতে স্থল ও জল সীমান্তে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং পুলিশ অতিরিক্ত টহল জোরদার করেছে।

এরপরও গত কয়েক দিনে নিপীড়িত কয়েক হাজার রোহিঙ্গা টেকনাফের লেদা ও উখিয়ার কুতুপালংয়ের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।

মঙ্গলবার বিকালে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ঘুরে দেখা যায়, আগে থেকে এখানে অবস্থান করা রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুরা বস্তি সংলগ্ন পাহাড়ে মৃত্যুর মুখে থাকা স্বজন ও প্রতিবেশীদের ঘরে নিতে অপেক্ষা করছেন। তবে বিজিবি সদস্যরা তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিলে তারা বস্তির পাহাড়ে অবস্থান নেয়।

রোহিঙ্গা বস্তির বাসিন্দা আবু তৈয়ব জানায়, ‘আমরাও নিপীড়িত হয়ে দেশ ছেড়েছি। তাই বিপদাপন্ন হওয়ার যন্ত্রণা বুঝি। গত রোববার ভোররাত থেকে বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবার নিয়ে এসেছেন। আমাদের সঙ্গেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি।’

আবু তৈয়বের সহযোগিতায় বাংলাদেশে আসা ১১ সদস্যের একটি রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে এই যুগান্তরের প্রতিবেদকের দেখা হয়।

পরিবার প্রধান মোহাম্মদ হাসেম (৩০) জানান, তারা মংডু কেয়ারীপাড়ার বাসিন্দা। মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ায় গত কয়েক দিন বনে-জঙ্গলে লতাপাতা খেয়ে অবস্থান করি। প্রায় ছয় মাইল পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে নাফনদী পর্যন্ত এসে নৌকায় উনচিপ্রাং সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখানকার (বাংলাদেশে) জন্য বোঝাস্বরূপ। কতটুকু অসহায় হলে মানুষ নিজ জন্মভিটা ছাড়ে তা আমাদের অবস্থায় না পড়লে কেউ বুঝবে না। এখানকার সরকার কারাগারে দিলেও তো প্রাণে বাঁচব। ওখানে (রাখাইনে) পাখির মতো গুলি আর পশুর মতো জবাই করে হত্যা করা হচ্ছে।’

মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পে আসা কামাল আহমদ (৪৫) জানান, কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে তারা একসঙ্গে ৩৫ পরিবারের দেড় শতাধিক লোক একই সীমান্ত দিয়ে এপারে এসেছেন।

এভাবে গত রোববার থেকে কুতুপালং বস্তিতে প্রায় দুই হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রয় নিয়েছেন বলে তার ধারণা।

তারা জানান, প্রথমে তল্লাশি করে বাড়ির ব্যবহারের দা ও ধারালো অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশ। এরপর তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পথে যাকেই পাচ্ছে গুলি করছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে রাখাইন যুবকরা। তারা অনেক যুবক, তরুণী ও শিশুকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেছে।

এদিকে ছয় দিন আগে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ইদ্রিস নামে এক রোহিঙ্গাকে রোববার মধ্যরাতে আটক করেছে কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ।

ইদ্রিস মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার ভুচিদং গ্রামের বাটু মিয়ার ছেলে। রোববার তাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দেয়ার পরপরই তাকে আটক করা হয়।

কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক বলেন, গত এক সপ্তায় শতাধিক পরিবারের প্রায় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নতুন করে কুতুপালং বস্তিতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মাঝে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশী। পুরুষের সংখ্যা কম। যারা এসেছে তাদের অনেকের পরিবারের প্রধান নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন।

আবু ছিদ্দিক আরও জানান, কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মঙ্গলবার ভোরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের উনছিপ্রাং সীমান্তে, হোয়াইক্যং ও বালুখালী চেকপোস্ট এলাকায় আটকে রেখেছে বিজিবি সদস্যরা।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ খবর পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে। এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি।

কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্প ইনচার্জ আরমান শাকিল বলেন, তার ক্যাম্পে যেন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কথা অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ঘুমধুম, তুমব্রু ও বালুখালীসহ তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাটালিয়নের আওতায় থাকা বিওপি সদস্যরা মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১১ পুরুষ, ২০ নারী ও ৩৫ শিশুসহ ৬৬ জনকে অনুপ্রবেশকালে আটক করে স্বদেশে ফেরত পাঠিয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন মিয়ানমারের জাতিগত নিপীড়ন থেকে প্রাণ রক্ষায় সীমান্ত পেরিয়ে কিছু রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে স্বীকার করেছেন।

তবে তিনি বলেন, ‘অনুপ্রবেশের সঠিক হিসাব দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রাণের মায়ায় ঝুঁকি নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা মুসলিম অনুপ্রবেশ করে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।’