রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর হামলা আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার

rakhayan_31528_1479785266.jpg

ফাইল ছবি

পুশব্যাকের সময় মানবিক আচরণ করবে বাংলাদেশ
টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে পড়েছে মিয়ানমার। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

এদিকে রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সতর্ক অবস্থান বহাল রয়েছে। রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের পুশব্যাক করার সময় মানবিক আচরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি সীমান্তে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত লিয়াজোঁ অফিস চালু এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কাঠামো চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত সাড়া দেয়নি মিয়ানমার।

নিউইয়র্কের একটি কূটনৈতিক সূত্র সোমবার জানিয়েছে, ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নিষ্ঠুরতা নিয়ে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ আলোচনায় মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে এতে উপস্থিত বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী চরমভাবে মানবাধিকার লংঘন করছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি বৈঠকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, এ অভিযানে বেসামরিক নারী ও শিশুদের ওপর চরম নিষ্ঠুরতা দেখানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এছাড়াও নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, জাপান, ফ্রান্স, মিসর ও সেনেগালের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত থেকে নিষ্ঠুরতার নিন্দা জানিয়েছেন। তারা রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা কর্মীদের প্রবেশ বন্ধ করার সমালোচনা করে তা চালু রাখার অনুমতি দিতে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা অভিযান চলাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নিষ্ঠুর আচরণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। সম্প্রতি জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা এক বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যের ঘটনায় তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি মিয়ানমারের প্রতি নিষ্ঠুরতা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে আত্মরক্ষার জন্য যারা পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে চাইছেন তাদের জন্য সীমান্ত খোলা রাখার সুপারিশ করেছে।

জানতে চাইলে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা সোমবার বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। বাংলাদেশ আগেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করেছে। তাদের ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। এবার আবার নতুন করে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে বলছে। কিন্তু ইউএনএইচসিআর কি এ গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, এ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার?’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা মিয়ানমারের সমস্যা তাদেরই সমাধান করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে মিয়ানমার এ সমস্যার সমাধান করে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রিলিফ দিয়ে হোক, সেটেল করে হোক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে মিয়ানমারকে সহায়তা করা। যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, ইসলামী বিশ্ব এমন কি বাংলাদেশও সহায়তা করতে পারে’।

অনুপ কুমার চাকমা মনে করেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানযোগ্য। দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রেখে, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে এবং সমস্যাটিকে খণি।ডতভাবে না দেখে সার্বিকভাবে দেখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শব্দটি নিয়ে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের আপত্তি আছে। এ মুসলিম জনগোষ্ঠী নিজেদের রোহিঙ্গা পরিচয় না দিলে মিয়ানমারের নাগরিক হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে নিলে অনেক অধিকার পাবেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তাদের পরিচয় মেনে নেয়ার দাবি করতে পারেন।

সাবেক এ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এ সমস্যা বড় করছে। সমস্যার সমাধান করতে দিচ্ছে না। এ সমস্যা বাড়তে থাকলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা আরও দুরবস্থার মধ্যে পড়বে। তারা বাংলাদেশে চলে আসবে। এখান থেকে স্বার্থান্বেষীরা সুযোগ খুঁজবে। তাই সবাইকে এ বিষয়টি বুঝতে হবে।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হকের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কর্মকর্তারা বলছেন, বৈঠকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়। মানবিক কারণে জাতিসংঘ সাহায্য সংস্থা ইউএনএইচসিআরের আহ্বানের বিষয়টি সরকার অবগত রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত আছে। রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে দেয়া হবে না। কেউ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে তাকে পুশব্যাক করা হবে। তবে পুশব্যাক করার সময় তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে।

বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নৌকাযোগে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় বিজিবি তাদের মধ্যে অভুক্তদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ বুঝিয়ে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। তাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, এসব রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার সময় গানশিপ থেকে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে। সেখানে আতংক ছড়ানো হচ্ছে যে, এসব রোহিঙ্গারা আবার হামলা চালাতে চায়। ফলে সেখানে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে ৯ অক্টোবর সমন্বিত হামলায় মিয়ানমারের নয়জন বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এবং পাঁচ জন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার জের ধরেই দেশটির সেনাবাহিনী নিরাপত্তা অভিযান শুরু করেছে। বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। হামলাকারীরা যাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষ্যে সীমান্ত সিল করে দিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক অভিযান চলাকালে ৬৯ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন বলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে।

বিভিন্ন সূত্রের খবরে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। অভিযান পরিচালনাকালে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গারা ব্যাপকহারে অনুপ্রবেশের আশংকা করছে বাংলাদেশ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ চাপের মুখে পড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সঙ্গে আগামী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী নেপিতোতে অনুষ্ঠেয় পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক স্থগিত করেছে বাংলাদেশ।

ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপ থেকে নিজেদের রক্ষার কৌশল হিসেবে তড়িঘড়ি করে মিয়ানমার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বসার কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ মনে করে, এত কম সময়ে বৈঠকের প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈঠক থেকে ভালো ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনাও কম।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মিয়ানমার চাপের মুখে পড়ে বাংলাদেশের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করতে পারে। ফলে রোহিঙ্গা নিধনের প্রতিবাদে ঢাকায় ইসলামপন্থী দলগুলো কোনো বিক্ষোভ করলে তাকে জঙ্গি হিসেবে প্রচার চালাতে পারে মিয়ানমার। এ পরিস্থিতিতে তাই বাংলাদেশের কোনো দলেরই এমন কর্মসূচি না দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।