টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে কয়েক হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ

Teknaf-picR_3_20.11.16_tt-pic.jpg

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের একটি দল..রবিবার হ্নীলা নাইক্ষংখালী এলাকা থেকে তোলা ছবি।

নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ টুডে ডটকম |
টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে কয়েক হাজার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটেছে। রাতের অন্ধকারে নাফ নদী পেরিয়ে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এইসব রোহিঙ্গারা দলে দলে টেকনাফের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছে। গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হলে কিছু কিছু রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ হলেও গত এক সপ্তাহের মধ্যে অনুপ্রবেশের হার আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এরমধ্যে শনিবার রাতে কয়েক হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
রবিবার (২০ নভেম্বর) টেকনাফ সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বেশীর ভাগই নারী ও শিশু।

টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং উলুবনিয়া, বালুখালী, লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, খারাংখালী, ঝিমংখালী, উনচিপ্রাং, হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া, নয়াপাড়া, নাথমুড়া পাড়া, গুদাম পাড়া, ফুলের ডেইল, হোয়াব্রাং, নাইক্ষংখালী, আনোয়ার প্রজেক্ট সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে।

অনুপ্রবেশের পর রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে, লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প ও সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন মানুষের বাড়িঘরে ও ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের পর রবিবার ভোরে টমটম, সিএনজি ও মাহিন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের লেদা, নয়াপাড়া, হ্নীলা এলাকার দিকে যেতে দেখেছে স্থানীয়রা। আবার অনেককে বিভিন্ন যানবাহনে কক্সবাজারের দিকে যেতে দেখা গেছে।
টেকনাফের বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের গৌজিবিল, রাইম্যাবিল, জাম্বনীয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে আসা কয়েকটি দলের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সপ্তাহ যাবৎ মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম গুলোতে হামলা চালিয়ে অধিকাংশ পুরুষদের আটক করে নিয়ে যায়। তাদের বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিবারের অনেককে হত্যা করে ও নারীদের ধর্ষন করে। বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার পর তারা মিয়ানমারের নাফ নদী উপকূলে প্যারাবন ও জঙ্গলে অনাহারে অর্ধাহারে বেশ কয়েকদিন কাটানোর পর শেষে কোন উপায়ান্তর না দেখে জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। আরও অনেক রোহিঙ্গা নারী পুরুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানায় তারা।
টেকনাফের সীমান্তের দালাল ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মিয়ানমারে নৌকা পাঠিয়ে তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয় বলে জানায় তারা। এতে তাদের জনপ্রতি ১ হাজার থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।
আবার এইপারে নারীরা শিকার হয়েছে লুটপাটের। তাদের পরিধিয় স্বর্ণালংকার দালালরা ছিনিয়ে নেয় বলে জানায় তারা।
এই দলের একজন জানায়, তাদের সাথে অন্তত ৫শ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এভাবে প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে শনিবার রাতে ৫শ থেকে ১হাজার করে ৫ হাজারের অধিক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া জানান, অনেক অসহায় রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ভোরে সীমান্ত পার হয়ে ক্যাম্পে আসলে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্থরে গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনকে মুঠোফোনে সেই সংবাদ জানান।
তিনি জানান, বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গারা চায়না সীমান্ত দিয়ে নতুন কোন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটুক। তারা চায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে যাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়।
এদিকে টেকনাফস্থ ২ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে.কর্ণেল আবুজার আল জাহিদ জানান, অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সর্তক রয়েছে। তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য তারপরও কিছু কিছু এলাকায় দালালদের সহযোগীতায় কিছু রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এই ব্যাপারে জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সাধারন সম্পাদক কায়সার পারভেজ চৌধুরী জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে গেলে সেটা দেশের জন্য বহুমাত্রিক সমস্যা হয়ে দেখা দিবে, তাই তাদেরকে নির্দিষ্ট স্থানে একিভূত করে রাখার দাবী জানান তিনি। পরবর্তীতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় তাদেরকে যাতে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়।