আরকান জ্বলছে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে

pic-1223333.jpg

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া |
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত কেন্দ্রীক রোহিঙ্গা পাচারকারী সিন্ডিকেট ও ঘাট গুলো ক্রমন্বয়ে সরব হয়ে উঠছে বলে খবর পাওয়া গেছে। স্থল ও জলজ সীমান্তের অন্তত ১১ টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারের জাতীগত সহিংসতা কবলে পড়া অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

গত কয়েক দিনে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে শত শত রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমার রাখাইন প্রদেশে উক্ত সহিংসতার ঘটনায় ৩০ হাজার মানুষ গৃহীন হয়ে পড়েছে এবং তাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলে দেওয়ার আহব্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে কোন রোহিঙ্গা এদেশে ঢুকতে দেওয়া হবেনা। কিন্তু রোহিঙ্গারা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন ও জুলুমের কথা বলে এদেশে পালিয়ে আসছে। ৯ অক্টোবরে সহিংস ঘটনার পর থেকে রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী বিজিপি মুসলমানদের বাড়ীতে আগুন দিয়ে জালিয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিশোধ প্ররায়ন হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর জুলুম অত্যাচার নির্যাতন গ্রেপ্তার সহ নানা ধরনের অত্যাচার করছে।

গতকাল সোমবার সকাল ১০ টায় উখিয়ার কুতুপালং আমগাছ তলা এলাকায় দেখা হয় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শত শত রোহিঙ্গা। জানতে চাইলে গতকাল সোমবার সকালে টেকনাফের নয়াপাড়া, জিম্মনখালী, কাঞ্জন পাড়া, উনসি পেরাং এলাকার ঘাট দিয়ে বাংলাদেশের এপারে আসতে মিয়ানমার দালালদের কাছে ওই দেশের ৩০ হাজার টাকা ও বাংলাদেশের দালালদের কাছে জন প্রতি ২ হাজার টাকা করে দিতে হয় বলে মিয়ানমার, মংডুর খিয়ারী পাড়া গ্রামের মোঃ সেলিমের স্ত্রী তৈয়বা বেগম (২৫) জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার সকাল ১০ টায় তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য মোঃ আলম (৭), আহম্মদ হোছন (৩) ও মোঃ শফিক (১৮ মাস) কে নিয়ে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য টেকনাফের নয়াপাড়া থেকে বাসযোগে আসে।

খিয়াড়ী পাড়া গ্রামের মোঃ ইসলাম (৭২) জানান মিয়ানমার সেনাবাহিনী অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে বাঁচার জন্য সে তার পরিবারের ৯ সদস্য নিয়ে সোমবার ভোরে কুতুপালং বস্তি এলাকায় আশ্রয় নেয়।

একই ভাবে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার মংডু শহরের খিয়াড়ী পাড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (৭০), নুরুল কবির (৩৫), ফজল করিম (৩২), মোঃ কবির (২৫), ফজল করিম(৪০) মোঃ ইউনুছ (৪০), লুৎফুর নেছা (২৫), নুরুল আলম (৩০), মোঃ কবির (৪৫), খাইরুল আমিন (১৮), শামশুল আলম ( ৪০), আনিছুল্লাহ (৩০) আব্দুল আমিন (১২) তারা ৫০ পরিবারের একটি দল সোমবারে নয়াপাড়া থেকে বাসে করে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেয়।

এছাড়াও মোঃ ছালাম বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের ঘর বাড়ী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মৃত আলি হোছনের ছেলে খিয়ারী পাড়া গ্রামের জিয়াবুল হক জানান, সোমবার দুপুর ১ টায় তার বৃদ্ধমা পেঠান খাতুন (৮০) কে নিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে ঢুকার আগেই এ প্রতিনিধির সাথে কথা হয়। তারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশের বর্বরুচিত নির্যাতনের কথা তোলে ধরেন। দুপুর ১ টায় একই ভাবে মিয়ানমর থেকে পালিয়ে আসা মোঃ ইদ্রিস (২২) তার বাবা আব্দুল গফ্ফার মা, ভাই বোন ৯ জন কে নিয়ে এবং খিয়ারী পাড়া গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (২০) পরিবারের ৬ জনকে নিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নেন।

এ ভাবে গতকাল সোমবার ও রোববার উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে প্রায় ১ হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা নাগরিক এদেশে পালিয়ে এসেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা কুতুপালং ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহম্মদ বলেন, সোমবারে কমপক্ষে দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে বলে সে শুনেছেন। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কথা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য ১৯৯১ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারে সামরিক সরকারের নির্যাতন নিপীড়নের কথা বলে আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এ দেশে চলে আসে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও বর্তমানে নয়াপাড়া ও কুতুপালং ক্যাম্পে ৩২ হাজার রেজিষ্ট্রাট রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এ ছাড়াও কুতুপালং , লেদা ও মোছনী এলাকায় দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ঝুপড়ি বেধে আনরেজিষ্ট্রাট রোহিঙ্গা হিসাবে বসবাস করছে। কুতুপালং আনরেজিষ্ট্রাট ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আবুছিদ্দিক জানান, গতকাল সোমবার ও রোববার মিয়ানমার থেকে ১ হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা নাগরিক কে তারা আতœীয় স্বজনদের বাসায় নিয়ে গিয়ে খাবর দিয়ে রাখা হচ্ছে বলে সে জানান।
সে আরো জানান টেকনাফের নয়াপাড়া থেকে উখিয়ার কুতুপাং রোহিঙ্গা বস্তিতে আসার পথে যাত্রী বাহি বাস উল্টে ৩ জন রোহিঙ্গা গুরুতর আহত হয়ে কুতুপালং এম এস এফ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কথা জানার জন্য কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকারের মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন করেও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল খায়ের জানান, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে ক্যাম্প এলাকায়।