বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন মান্নান খান দম্পতি

3_76776.jpg

ছয় দফা পেছানোর পর অভিযোগ গঠনের শুনানি ২২ জানুয়ারি

সম্পদের তথ্য গোপন ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে আলোচিত দুর্নীতির মামলা

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান ও তার স্ত্রী হাসিনা সুলতানার দুর্নীতির বিচার অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য হয়েছে। প্রসঙ্গত এর আগে অভিযোগ গঠনের শুনানি ছয় দফা পিছিয়েছে। এছাড়া হাইপ্রোফাইল ক্যাটাগরির এ মামলার তদন্ত শেষ করতে দুদক সময় নেয় প্রায় এক বছর, আর বিচার শুরু করতেই এরই মধ্যে পার হয়েছে দেড় বছর।

এই দম্পতির বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে ২০১৪ সালে মামলা হলেও নানা কারণে বিচার শুরু করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। যদিও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে গত বছর একই সময়ে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়। দুর্নীতির মামলায় বদির সাজা হয়েছে ৩০ অক্টোবর। কিন্তু মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে গত দেড় বছরে বিচারই শুরু করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউশন। তাদের দাবি- আসামি পক্ষের সময়ের আবেদনের কারণে বিচার শুরু করতে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তবে পরবর্তী ধার্য তারিখে সে ধরনের পরিস্থিতি থাকবে না বলে আশা করছেন তারা। গত ৮ বছরে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য বদি ছাড়া দুর্নীতির দায়ে কোনো প্রভাবশালীর বিচার বা সাজা দুদকের ঘরে আসেনি। এ ব্যর্থতা দুদককে ভাবিয়ে তুলেছে। আর সে কারণেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের বিচারের দিকে বেশি করে মনোযোগ দিচ্ছে সংস্থাটি। ঢেলে সাজানো হয়েছে দুদকের আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত প্রসিকিউশন সেল। এমনকি সুপ্রিমকোর্টের মাধ্যমে দুর্নীতির মামলা বিচারে নিয়োজিত বিশেষ জজ আদালতের কয়েকজন বিচারককেও সতর্ক করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় দুদকের আইনজীবীদের ডায়েরিতে এখন দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য যুক্ত হচ্ছে কোনো না কোনো প্রভাবশালীর নাম।

এদিকে ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সাবেক সংসদ সদস্যসহ অন্তত দুই ডজন হাইপ্রোফাইলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার বিচার বিশেষ জজ আদালতে চলছে বলে জানা গেছে। বিচার নিষ্পত্তির তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের আরও বেশ কিছু দুর্নীতির মামলা। উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশের কারণে মামলাগুলোর বিচার বন্ধ ছিল। দুদকের প্রসিকিউশন সেল স্থগিত থাকা সেই মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে বিচারের জন্য সচল করছে। দুদক মনে করে, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করে নজির স্থাপনের মতো রায় পাওয়া গেলে, সমাজে এর প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে দুদকের সিনিয়র প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি মামলার বিচারে নানা ঘাটে প্রতিবন্ধকতা আছে। তা কাটিয়ে আমরা চেষ্টা করছি নজির স্থাপনের মতো বিচার প্রতিষ্ঠা করতে।

মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও তদন্ত : ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে ৭৫ লাখ ৪ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলা দায়েরের তিন দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট মান্নান খান ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একই বছরের ২১ অক্টোবর মামলা করে দুদক। এর দু’দিনের মাথায় ২৩ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন হাসিনা সুলতানা। এরপর শুরু হয় মামলার তদন্ত। কিন্তু এই তদন্ত শেষ করতেই দুদক প্রায় এক বছর সময় নেয়। দুদকের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট মান্নান খানের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে মান্নান খানের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে দেখা যায়, তার আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৬ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং তিনি সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন ৩১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। তদন্ত শেষে হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৯ জুন আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন। চার্জশিটে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিচার শুরু করতেই কেটে গেছে দেড় বছর : মান্নান খানের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয় ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট। এরপরের মাসে অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। এরপর নানা বাহানায় বিচার শুনানি পেছাতে থাকে। আদালত সূত্রে জানা যায়, মান্নান খানের মামলাটি বিচারের জন্য বদলি হওয়ার পর ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর এটি আমলে নেয়ার বিষয়ে শুনানি শেষে বিচারের জন্য গ্রহণ করা হয়। মামলা বিচারের জন্য গৃহীত হওয়ার পর বিচার শুনানির জন্য ঢাকার ৩নং বিশেষ জজ আদালতে বদলি করা হয়। ৭ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত মামলায় আসামি মান্নান খানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। কিন্তু শুনানির নির্ধারিত দিন চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি তার পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়। দুদক প্রসিকিউশন ওইদিন শুনানি করতে জোর চেষ্টা চালালেও আসামির সময়ের আবেদনের কারণে চার্জ শুনানি হয়নি। এভাবে পরবর্তীকালে ১৭ জানুয়ারি, ২৪ জানুয়ারি, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২৪ এপ্রিল, ৩১ জুলাই এবং সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে চার্জ শুনানির কথা থাকলেও প্রায় প্রতিটি তারিখে তার পক্ষে শুনানি করতে সময়ের আবেদন করা হয়। দুদকের আইনজীবীদের আপত্তির মুখে তার পক্ষে সময়ের আবেদন মঞ্জুরও করা হয়। পরে আগামী ২২ জানুয়ারি মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন শুনানির মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর দিন ধার্য করেন বিচারক।

মান্নান খানের স্ত্রী হাসিনা সুলতানার বিরুদ্ধে সম্পদের মামলার বিচারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। মামলাটি বিচারের জন্য ২০১৫ সালের ১১ মে ঢাকা মহানগর আদালতে বদলি হয়। এরপর সেই আদালত থেকে ৭নং বিশেষ জজ আদালতে চার্জ গঠন শুনানির মাধ্যমে বিচার শুরুর জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু দফায় দফায় সময়ের আবেদন করায় তার বিরুদ্ধেও বিচার শুরু করতে পারেনি দুদক প্রসিকিউশন। সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর মান্নান খান ও তার স্ত্রী আদালতে হাজির হলেও তাদের আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমানের ব্যস্ততার কারণে চার্জ গঠন শুনানি হয়নি। দু’জনের মামলা এখন ৩নং বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলায় দুদকের পক্ষে নিয়োজিত প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মীর আহমেদ আলী সালাম যুগান্তরকে বলেন, আগামী তারিখে আর কোনো ওজর-আপত্তিতে আমরা যাব না। বিচার শুরু করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।