এসএসসির ফরম পূরণে গলাকাটা ফি

images-2.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে দেশের বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসায় অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে যার মতো ফি আদায় করছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে সিন্ডিকেট স্কুলগুলো অভিন্ন হারে ফি নিচ্ছে। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও অভিভাবকরা বিক্ষোভ করেছেন। তবে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই ‘অবৈধ’ দাবি মেটাচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এবারের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। তার ফরম পূরণের শেষদিন আজ।

এ ব্যাপারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, এসএসসিসহ পাবলিক পরীক্ষার ফি আদায়ের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত স্থায়ী নির্দেশনা দেন। তার আলোকে শিক্ষা বোর্ড নির্ধারিত ফি’র বেশি নেয়া যাবে না। তারপরও কেউ যদি বাড়তি ফি আদায় করে, তাহলে তারা আদালত অবমাননার অপরাধ করেছেন। এ অপরাধে সংশ্লিষ্ট স্কুলের পরিচালনা কমিটি (এসএমসি) ভেঙে দেয়া হবে। এছাড়া অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।

গত ৯ ও ১০ নভেম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সরেজমিন পরিদর্শনকালে রাজধানীসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন স্কুলের বেশকিছু শিক্ষক-অভিভাবককে দেখা যায়। শিক্ষকরা এসেছেন বাড়তি ফি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে করণীয় জানতে। আর অভিভাবকরা অভিযোগ জানাতে এসেছেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকারের কক্ষে কথা হয় মোহাম্মদুপর গার্লস হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মোকারম হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বোর্ড ফি’র বাইরে সেশন চার্জ ৫ হাজার ৩০০ এবং মাসিক ৭৫০ টাকা টিউশন ফি হিসেবে তিন মাসের অর্থ নিচ্ছেন। কিন্তু অভিভাবকরা তা দিতে চাইছে না। তাই বোর্ডের নির্দেশনা জানতে এসেছেন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ ব্যাপারে বলেন, এসএসসি পরীক্ষার্থীরা দশম শ্রেণীতে একবার সেশন চার্জ দিয়েছে। যেহেতু নতুন বছরে তারা ক্লাস করছে না, তাই তাদের কাছ থেকে সেশন চার্জ নেয়া যাবে না। টিউশন ফিও দুই মাসের বেশি নেয়া যাবে না।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, মিরপুরের বাংলা স্কুল ও কলেজসহ রাজধানীর আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাড়তি ফি আদায় করছে। এক্ষেত্রে কোনো কোনো স্কুল কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। বোর্ড ফি আলাদা নোটিশে দিয়ে আদায় করা হচ্ছে। কোচিং ফি’সহ বাকি অর্থ নেয়া হচ্ছে পৃথকভাবে। বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোচিং-মডেল টেস্ট ফি, বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী, বার্ষিক চার্জ, পরিবহন, তিন মাসের বেতন, পিকনিক, বিদায় অনুষ্ঠান ইত্যাদি খাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। স্কুলভেদে এ ফি দেড় থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রমাণ না রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানই রসিদ দিচ্ছে না বলেও অভিভাবকদের অভিযোগ।

৯ নভেম্বর বাংলা স্কুল ও কলেজের কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় বোর্ডের প্রধান ভবনের লিফটের সামনে। নাম প্রকাশ না করে একজন অভিভাবক বলেন, ৮ হাজার ২২৫ টাকা ফরম পূরণের জন্য আদায় করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেশন চার্জ ও স্কুলের দুই মাসের টিউশন ফি, মডেল টেস্ট ২ হাজার এবং বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য ৫০০ টাকা। মিরপুর প্রতিনিধি জানান, বাড়তি ফি আদায় নিয়ে কয়েকদিন ধরে এ স্কুলে অভিভাবকরা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। শনিবারও স্কুলের অধ্যক্ষ অভিভাবকদের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেন। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ বদরউদ্দিন হাওলাদার বলেন, অতিরিক্ত অর্থ নেয়ার কথা সঠিক নয়। বোর্ড যা নিতে বলেছে তাই নিচ্ছি। এর বাইরে সেশন চার্জ, টিউশন ফি, কোচিং ও মডেল টেস্ট ফি ইত্যাদি নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকের পরিবর্তে নগদে টাকা নেয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেন।

প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরেও ফরম পূরণের এ মৌসুমকে শিক্ষার্থীদের ‘গলাকাটার’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞান বিভাগের জন্য নির্ধারিত ফি ১ হাজার ৭৮৫ টাকা। ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে এর চেয়ে ২১০ টাকা কম। কিন্তু সর্বোচ্চ ১০-১২ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, সন্তান ভর্তি করায় আমরা অভিভাবকরা স্কুলের কাছে রীতিমতো জিম্মি। যে কারণে যত অন্যায়-জুলুমই চলে, তার প্রতিবাদ বলতে গেলে কেউ করতে চায় না। তাই নামে-বেনামে দেয়া অভিযোগ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমলে নেয়া উচিত।

বাউফল প্রতিনিধি শিবলী সাদেক জানান, ফরম পূরণে বাউফল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাউফল আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়, খেজুরবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নাজিরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাউফল ছালেহিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ধানদি সিনিয়র মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীপ্রতি সাড়ে ৩-৪ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ফি উপজেলা শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে ধার্য করা হয়েছে। এ নিয়ে অভিভাবকদের অজস্র অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি জানেন না উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অলি আহাদ।

ফি নির্ধারণ করে দেয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন খেজুরবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করীম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ৩ হাজার ৭৫৫ টাকা উপজেলা শিক্ষক সমিতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, তবে আমরা তা আদায় করি না। তবে ফি নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম বলেন, বোর্ড ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

বরিশালের আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি জানান, সদর স্কুল ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বাড়তি ফি নেয়ার অভিযোগ আছে। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে শুধু বোর্ড ফি’র কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মৌখিকভাবে অতিরিক্ত টাকার কথা জানিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা। কোনো কোনো স্কুলে কোচিং ফি’সহ ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। অনেক স্কুল ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত কোচিং ফি আদায় করছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা না থাকায় তিনি ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। দাগনভূঞা প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ২৮ হাইস্কুলের মধ্যে কয়েকটি স্কুল বাদে বাকিগুলোয় অতিরিক্ত ফি নেয়া হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির অসাধু সদস্য ও শিক্ষকরা চালাচ্ছেন এ বাণিজ্য। নেয়া হচ্ছে ৪-৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএসসি ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায়ের কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানান।

কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, কাউখালী কেন্দ্রীয় আলিম মাদ্রাসার (কমপ্লেক্স) দাখিল পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদ্রাসার ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩ জনের স্বাক্ষরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, প্রতি শিক্ষার্থীকে ২ হাজার ৮০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। এ বিষয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হোসাইন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ বিল, সেশন চার্জ ও খরচাপাতি বাবদ কিছু টাকা বেশি নেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাবণী চাকমা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান।