জলবায়ু অর্থায়নে চাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা স্লোগানে মাতামুহুরীর তীরে ব্যতিক্রমী মানববন্ধন

TIB-Chakaria-Picture-09-11-161.jpg

এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া |
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরী নদীর তীরে ‘জলবায়ু অর্থায়নে চাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ’ স্লোগানে গতকাল বুধবার সকালে ব্যতিক্রমী মানববন্ধন কর্মসুচী পালন করা হয়েছে। মরক্কোর মারাকাশে ৭-১৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য কপ-২২ জলবায়ু সম্মেলন উপলক্ষে উপজেলার প্রাণকেন্দ্র চিরিঙ্গা স্টেশনের অদুরে মাতামুহুরী নদীর মোহনায় টিআইবি’র সহযোগিতায় সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এদিন সকাল সাড়ে দশটায় কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চকরিয়া পৌরশহরের চিরিঙ্গা স্টেশনের নিউ মার্কেট পয়েন্টে প্রথম মানববন্ধন শুরু হয়। এর পর শুরু হয় পদযাত্রা। চিরিঙ্গা স্টেশন থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি মাতামহুরী পাদদেশে গিয়ে পুনরায় মানববন্ধন রচনা করে।
টিআইবি’র চকরিয়া উপজেলা এরিয়া ম্যানেজার মো. জসিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় ও সনাক উপজেলা সভাপতি আলহাজ অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সনাক সদস্য মোহাব্বত চৌধুরী, ইয়েস উপ-কমিটির আহবায়ক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জিয়া, স্বজন সমন্বয়ক এইচএম ইয়াসির আরাফাত চৌধুরী ও ইয়েস দলনেতা মিজানুর রহমান।
মানববন্ধনে অংশ নেন সাংবাদিক আবদুল মজিদ, শাহরিয়ার মাহমুদ রিয়াদ, ইয়েস উপ-দলনেতা শ্যামলী জন্নাত ডলি ও নুর মোহাম্মদ প্রমুখ। মানববন্ধনে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ক্ষতিগ্র¯’ জলদাস সম্প্রদায়ের শতাধিক নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফুতভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন দাবীতে প্ল্যাকার্ড বহন করে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্ব ব্যাংক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ক্ষতিপূরণ হিসাবে অনুদান পাওয়ার কথা, ঋণ নয়। বিশ^ব্যাংক বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ‘দরিদ্র ও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ জনগণের পাশে থাকাকে ঋণ ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে যা অগ্রহণযোগ্য। যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানে বিশ^ব্যাংকের প্রকৃত অভিপ্রায় থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ওপর অধিকতর ঋণের ভার ও বোঝা চাপানো থেকে বিশ^ব্যাংককে বিরত থাকতে হবে। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থ বাংলাদেশ যেন দ্রুত পেতে পারে, সেই প্রক্রিয়ায় বিশ^ব্যাংক ইতিবাচক ভূমিকা পালনের উপায় খোঁজার প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে।
বক্তারা বলেন, বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সবুজ জলবায়ু তহবিলের ন্যায় সূত্র থেকে অনুদান প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের অভিগম্যতাকে সহজতর করার ক্ষেত্রে তার সম্ভাব্য সামর্থ্য এবং দক্ষতার সদ্ব্যবহার করলে বিশ^ব্যাংক ভালো করবে। যখন ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশকে অনুদান প্রদানের কথা তখন জলবায়ু তহবিলের নামে সরকার যেন কোনো ঋণ গ্রহণ না করে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনুদান প্রদানে উন্নত দেশসমূহের প্রতিশ্রুতি পূরণে আগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষে বাংলাদেশ সরকরের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কারিগরী এবং কূটনৈতিক দক্ষতা সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করার আহবান জানান।
কপ-২২ সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির আওতায় জলবায়ু অভিযোজনের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ এবং বরাদ্দ ও ব্যবহারে স্ব”ছতা, জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে মানববন্ধনে কতিপয় দাবী উত্থাপন করা হয়। উল্লেখযোগ্য দাবীগুলো হলো: দারিদ্র্য হ্রাসে উন্নয়ন তহবিলের বরাদ্দ অব্যাহত রাখা এবং উন্নত দেশসমূহ কর্তৃক কার্যকর প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল সরবরাহে একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা উপ¯’াপন করতে হবে, প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণে বাংলাদেশের অব¯’ান নির্ধারণের লক্ষে সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার আয়োজন করতে হবে, এলাকা-ভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রভাব যাচাই এবং প্রাপ্ত বিজ্ঞান-ভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে চাহিদা ভিত্তিক (দীর্ঘ এবং স্বল্প মেয়াদী) সরকারি উৎস হতে শুধুমাত্র অনুদানকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০৩০ পর্যন্ত অর্থায়নের রোডম্যাপ প্রণয়ন করা,জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পরিকল্পিত কার্যক্রম নির্বিঘেœ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন রেজিলিয়েন্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ) পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ অব্যাহত রাখতে হবে; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত সকল কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসীদের ব্যাপক ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে সকল অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে জাতীয়ভাবে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে; জলবায়ু তহবিলের স্ব”ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে জলবায়ু তহবিল এর আওতায় যে কার্যক্রম চলছে তার সকল প্রকার আর্থিক লেনদেনের প্রতিবেদন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে; জলবায়ু অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে সকল প্রকার অস্ব”ছতা, অব্যব¯’াপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ-মূলক ব্যব¯’া সুপ্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর করতে হবে; কোনো প্রকার অনিয়ম সংগঠিত হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।