টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে কয়েকটি সিন্ডেকেটের সহায়তায় ঘটছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ

Rohingha_file-pic_why-copy.jpg

শাহীনশাহ, টেকনাফ |

সম্প্রতি মিয়ানমারে সহিংসতার সূযোগে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গা নারী পুরুষদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের মাধ্যমে হাজার টাকা বাণিজ্য করছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্কে এসব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে সহায়তার পাশাপাশি তাদেরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। এ সহযোগিতার মাধ্যমে দৈনিক হাজার হাজার টাকা বাণিজ্য করছে হোয়াইক্যংয়ের কয়েকটি সিন্ডিকেট।

হোয়াইক্যং লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, মিনাবাজার ও ঝিমংখালী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কাঞ্জরপাড়া ২নং স্লুইস গেইট এলাকাটি দিয়ে অধিক হারে অনুপ্রবেশ ঘটছে বলেও জানা গেছে। তবে এই পয়েন্ট ছাড়াও সুযোগ মতো অন্যান্য পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে।

মাঝে মধ্যে টাকার ভাগ বাটোয়ারায় বনিবনা না হওয়ায় সিন্ডিকেটে ঝগড়া বিবাদে জড়িত হয়। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সহযোগিতাকরীদের তালিকা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে বিজিবির একটি সূত্র জানিয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, প্রায় মাসখানেক পূর্বে মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হয়। এ সূযোগে দীর্ঘ দিন ধরে মিয়ানমারে যাতায়াতকারী অসাধু ব্যবাসয়ীরা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য উৎসাহিত করে আসছে। এ সূযোগে ওইসব সিন্ডিকেট তাদেরকে অনুপ্রবেশ করিয়ে গোপনে নিজ নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে থাকে। পরে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে সুযোগ সুবিধামতে স্থানীয় বা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করার সূযোগ করে দেয়া হচ্ছে। তার বিনিময়ে রোহিঙ্গা নাগরিকদের প্রতিজন থেকে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানান লম্বাবিল, কান্জারপাড়া, নয়াবাজার ও খারাংখালী ও বালূখালী এলাকাবাসী।

৪/৫ দিন পূর্বে লম্বাবিল এলাকায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে স্বর্ণ ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এর ধারাবাহিকতায় কান্জারপাড়া এলাকার একটি সিন্ডিকেটের মধ্যে কাঞ্জরপাড়া এলাকার মৃত আব্দুল গফুর চকিদারের ছেলে জাহেদ হোসেন বাগুইন্যার নেতৃত্বে জব্বার আলীর ছেলে নুরুল আমিনসহ অপরাপর ভাইয়েরা, আমির আলীর ছেলে হামিদ হোছন, ফরিদ আলমের ছেলে হেলাল উদ্দিন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় পশ্রয়ে মরিয়া হয়ে উঠে। এর প্রতিবাদ করলে স্থানীয় মোঃ হাসানের ছেলে মোঃ শাহজাহানকে হুমকি ধমকি অব্যাহত রাখছে বলে অভিযোগ করেন। এর সূত্রে ধরে প্রতিবাদ করলে শনিবার (৫ নভেম্বর) রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয় ।

তবে নুরুল আমিন বলেন, কুখ্যাত ডাকাত একাধিক মামলার আসামী নুর মোহাম্মদ প্রকাশ লাদেনকে ধরিয়ে দেওয়ায় তারা এমন অভিযোগ করে বলে দাবী করে বলেন, তারাই এসব কাজে জড়িত রয়েছে।

নুর মোহাম্মদ প্রকাশ লাদেনের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে জড়িত ছিল। তবে অভিযোগ এই অনুপ্রবেশের ঘটনা নিয়ে প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার সুযোগ নিয়ে তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

স্থানীয়রা জানান, রেহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী সিন্ডিকেট রাতের অন্ধকারে ডিঙ্গি নৌকা করে নাফ নদীর ওপারে অর্থাৎ মিয়ানমারের সীমান্ত হতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করিয়ে তাদের বাড়িতে রাত যাপন করান।

তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়ার রেজিস্টার্ড ও রেজিস্টার্ড বিহীন ক্যাম্পে প্রেরণ করে। মিনাবাজারের ঝিমংখালী সিন্ডিকেটের মধ্যে ফরিদ আলমের ছেলে মোঃ মিজান, মোঃ হোছনের ছেলে মিজানুর রহমান, মৃত আব্দু জব্বারের ছেলে মোঃ আমিন, বজরুখ মিয়ার ছেলে মোবারক মিয়া, আশ্রফ আলীর ছেলে আলী হামদ, আবুল কাশেমের ছেলে মোঃ কামাল অন্যতম।

গত কিছুদিন পূর্বে তাদের সিন্ডিকেটের একজন অস্ত্রসহ বিজিবির হাতে আটক হয় এবং একজন পলাতক রয়েছে।

ঝিমংখালীর এ সিন্ডিকেটের অধিকাংশদের একাধিক করে মামলা রয়েছে বলে একটি বিশ্বস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছে।

লম্বাবিল এলাকার সিন্ডিকেটের মধ্যে বৈদ্য আব্দু রশিদের ছেলে জাফর আলম, মৃত সুলতান আহম্মদের ছেলে মমতাজ, আলী আকবরের ছেলে লালু, আব্দু জলিলের ছেলে ফরিদ আলম, আবুল হাশেমের ছেলে আয়াছ, আব্দু জলিলের ছেলে নুর হোসেন, কালা মিয়ার ছেলে ফজল, ফকির আহম্মদের ছেলে ছৈয়দ হোসেন অন্যতম।

হোয়াইক্যং ২ নং ওয়ার্ডের খারাইংগ্যাঘোনা এলাকার আবুল বশারের ছেলে আলী আকবর তার দুই ছেলে মোঃ রুবেল ও প্রকাশ মিড়াইয়া রেহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সাথে সরাসরি জড়িত। পাশাপাশি মালয়েশিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীদের মালয়েশিয়া পাচার করে থাকে। একই ওয়ার্ডের মৃত বদন আলীর ছেলে মোঃ লালূ, তার মেয়ে তৈয়বা আক্তার ও রোকেয়া বিগত ৩ বছর পূর্বে মিয়ানমারের দুই নাগরিককে বিয়ে দেন। লালুর বসত বাড়ির পার্শ্বে তার দুই মেয়েকে বাড়ী তৈরী করে দেয়া হয়। এতে অসংখ্য রোহিঙ্গা নাগিরক প্রতিনিয়ত আসা যাওয়া করে। তৈরী করা হয় রোহিঙ্গাদের অঘোষিত টার্মিনাল।

পাশাপাশি এ বিষয়ে হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু নিশ্চিত করে বলেন, এ তিনজন সিন্ডিকেট দীর্ঘ দিন ধরে এ ব্যাবসয়া জড়িত রয়েছে।

স্ব স্ব ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল গফফারসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিগণ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

একাধিক অভিযোগকারী বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে স্ব স্ব পয়েন্টের বিজিবির ক্যাম্পের টহলরত জওয়ানেরা ম্যানেজ করে এসব করে যাচ্ছে।

হোয়াইক্যং ফাঁড়ী পুলিশের ইনচার্জ এসআই মোঃ শাফায়েত আহম্মদ বলেন, সীমান্ত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ব্যবস্থা নিবে বিজিবি। তবে দায়িত্ব এলাকায় যে কোন দেশের অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এব্যাপারে হোয়াইক্যং বিওপির সদ্য যোগদানকৃত কোম্পানী কমান্ডার মোঃ ইব্রাহীম বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিজিবি টহল দলে সহযোগিতার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

২ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্ণেল মোঃ আবুজার আল জাহিদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।