আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড : দল ও সরকারকে পৃথক করার উদ্যোগ

alig-300x300.jpg

ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পৃথক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কোনো নেতা একই সঙ্গে মন্ত্রিসভাসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে দুই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয় না- এমন ধারণা থেকেই এ নীতি অনুসরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার প্রতিফলন ঘটেছে ২০তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত শাসক দলের কমিটিতে। গত কমিটিতে থাকা তিন মন্ত্রীকে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের সরকারি পদ থেকে সরিয়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো যুগান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪-এর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তিনি নিজেই দলের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। তখন সভাপতি হন এএইচএম কামরুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। একাধিক মন্ত্রীকেও বঙ্গবন্ধুর পথ অনুসরণ করতে হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরেই বঙ্গবন্ধুর ওই উদ্যোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডে ইতিবাচক আলোচনা শোনা গেছে। সে থেকেই সংগঠনের হাইকমান্ড দলকে সরকার থেকে আলাদা করার তাগিদ অনুভব করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় সভাপতি না হওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যেই মতামত ব্যক্ত করেন। যদিও সারা দেশের সর্বস্তরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর চাপে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব গ্রহণে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্য পদগুলোতেও এ উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটতে পারে।

আওয়ামী লীগের গত কমিটিতে অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। মঙ্গলবার ঘোষিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক পদে এসেছেন টিপু মুন্সী এমপি, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন অসীম কুমার উকিল। কমিটিতে পদ পাওয়া দু’জনের একজন টিপু মুন্সী জাতীয় সংসদ সদস্য। অসীম কুমার উকিল পুরোপুরি সাংগঠনিক ব্যক্তি। তিনি সংসদ ও সরকারের কোথাও নেই। গত কমিটির স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদকের পদে এখনও কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি। দলীয় সূত্র জানায়, এর আগে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দল ও সরকারকে আলাদা করার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন ছিল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অধিকাংশ নেতার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে দেয়া একাধিক ভাষণে আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি তিনি এ নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে জন্য নেতাকর্মীদের সজাগ থাকতে বলেছেন। পাশাপাশি আগামী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করার বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল নেতাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা যুগান্তরকে বলেছেন, ক্ষমতায় থাকার কারণে দল সরকারে মিশে গেছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ স্থানেই মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভালো সম্পর্ক নেই। তাই একসঙ্গে দল ও সরকারে দুটি পদে না রাখার বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত রয়েছে।

বর্তমানে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ গত কমিটিতে উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরাম বলা হয় প্রেসিডিয়ামকে। এ ফোরাম নীতিনির্ধারণী বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মাঠে-ময়দানের সাংগঠনিক কাজ করে মূলত সম্পাদকমণ্ডলী। ঘোষিত কমিটির ১৪ প্রেসিডিয়াম সদস্যের মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। তারা হলেন : মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম নাহিদ। এর বাইরে সৈয়দ সাজেদা চৌধুরী জাতীয় সংসদের উপনেতা। মন্ত্রিসভার বাইরে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফরউল্লাহ, পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, রমেশ চন্দ্র সেন ও অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান।

আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়ামের বাইরে ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটির (সম্পাদকমণ্ডলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক) নেতাদের একজনও মন্ত্রিসভায় নেই। চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে তিনজন মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন।