না.গঞ্জের রাজনীতিতে ফিরছেন সেই জাকির খান!

jakir_copy_28056_1476795108.jpg

অনলাইন ডেস্ক |
নারায়ণগঞ্জের এক সময়ের মূর্তিমান আতংকের নাম জাকির খান। ফের রাজনীতিতে ফিরছেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী।

জাকির ১৯৯৫ সালে স্থানীয় সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের কাছে শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সেখানে দাড়িয়েই কোমল পানীয় পান করে আলোচনায় উঠে আসেন।

উচ্ছেদের আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের এক সময়ের কলংক টানবাজার পতিতাপল্লীর একচ্ছত্র অধিপতি এই জাকির খানের কাছে মন্ত্রী-এমপিরাও ছিলেন অনেকটা নস্যি।

কলেজের গণ্ডিতে পা না দিয়েও যিনি হয়েছিলেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি। জেলা পুলিশের তালিকায় এখনও তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী। সেই জাকির খান এখন বাংলাদেশে, এমনকি পুলিশ-গোয়েন্দাদের নাকের ডগায় তার নারায়ণগঞ্জের বাড়িতেও থেকে গেছেন গত সপ্তাহে।

আইন-শৃংখলা বাহিনী বিষয়টি জানে না বললেও জাকির খানকে দেখেছেন তার নিজ এলাকা দেওভোগসহ শহরের অনেকেই। জাকির খান খুব শিগগিরই আদালতে আত্মসমর্পণ করছেন এমন গুঞ্জন উঠার পর তার ফিরে আসার বিষয়টি আরও বেশি পাকা-পোক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এই জাকির খানকে নিয়ে এখন উত্তাল নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতি। তার এ আগমনকে জেলার রাজনীতির জন্য, বিশেষ করে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে এক অশনিসংকেত মনে করছেন শহরবাসী।

কারণ, প্রবাসে থাকলেও শহরের অনেক ব্যবসায়ীকেই জাকির খানকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। কারণ, ভয়ংকর সন্ত্রাসীর পেশী শক্তির সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনীও।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একটি অংশের মদদেই দেশে এসেছেন তিনি। গত ১৫-২০ দিন ধরে জাকির খান রাজধানীর অভিজাত একটি এলাকায় অবস্থান করছেন।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির একটি অংশ নিয়মিত গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে আসছে। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাকির খান নারায়ণগঞ্জে তার দেওভোগের বাসায় দিনের বেলা এসে অবস্থান করেন।

তবে সন্ধ্যা নামার আগেই তিনি ঢাকায় চলে যান। কয়েকদিন আগে জাকির খানের বাসভবনে খুবই গোপনে চলে একাধিক বৈঠক। সেখানে কয়েকজন নেতাকর্মী তার বড় ভাই কবির খানের সঙ্গে কথা বলে চলে আসেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কথা বলছেন জাকির খান ও তার সমর্থক কয়েকজন।

জাকির খানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যেসব মামলায় জাকির খান আসামি কিংবা ওয়ারেন্ট আছে সেগুলোতে তিনি আত্মসমর্পণ করতে চাচ্ছেন।

আত্মসমর্পণের পর আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টা করবেন আইনজীবীরা। তবে এ প্রক্রিয়াতে যাতে আওয়ামী লীগ কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেজন্য একটি অংশের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে জাকির খানের বড় ভাই কবির খান জানান, আসলে জাকির খান কোথায় আছে তা সবারই জানা।

তিনি বলেন, এখনও নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ফেরার মত সময় হয়নি তার। তবে পরিবেশ অনুকূলে থাকলে রাজনীতি করার মতো অবস্থার সৃষ্টি হলে জাকির খান অবশ্যই জেলায় ফিরে রাজনীতি করবে।

তবে পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জাকির খান কয়েক দিন আগে এসেছিলেন। কিন্তু এখন নেই।

এব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, সন্ত্রাসীদের তালিকায় জাকির খান ১ নম্বরে কি না তা দেখে বলতে হবে। তবে তার নারায়ণগঞ্জে আসার বিষয়টি জানা নেই। এব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা হবে।

কে এই জাকির খান?

জাকির খানের বাবা মরহুম দৌলত খান ছিলেন তৎকালীন টানবাজার পতিতালয়ের গডফাদার। ১৯৮৯ সালে জাতীয় ছাত্র সমাজে যোগ দিয়ে উত্থান ঘটে জাকির খানের।

পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ফতুল্লার বিশাল বিসিকপল্লী তথা ঝুট সেক্টরের একক আধিপত্য কায়েম করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে দেওভোগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে আলোচনায় উঠে আসেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী।

১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে জাকির খান শহরের খাজা সুপার মার্কেটে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়ে জেলে যান।

সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর নাতি হিসেবে শহরে পরিচিত হয়ে ওঠেন জাকির খান। রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় সে মুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে কাশীপুর এলাকায় এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে দ্বিতীয় দফায় জাকির খানের ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।

আওয়ামী লীগের চার বছর জাকির খান থাকেন জেলে। ১৯৯৯ সালে স্বল্প সময়ের জন্য জেল থেকে বের হয়ে জাকির খান জেলা ছাত্রদলের সভাপতির পদটি পেয়ে যান।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মুন্সীগঞ্জে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে প্রায় পাঁচ মাস জেলে থাকেন জাকির খান।

সর্বশেষ ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিআরটিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

এ ঘটনায় জাকির খানকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন তৈমুর আলম খন্দকার। এর পরই তিনি নারায়ণগঞ্জ ছাড়েন। জাকির খান প্রথমে সিঙ্গাপুর ও পরে থাইল্যান্ডে গিয়ে ফেরার জীবন কাটাতে থাকেন।

সেখানে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে একটি থ্রি-স্টার হোটেলও কেনেন জাকির খান। পরে সেখান থেকে জাকির খান চলে যান দুবাইয়ে।