চট্টগ্রামে অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে পুলিশ

cht_27501_1476222584.jpg

তদন্ত হচ্ছে দুই গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে
অনলাইন ডেস্ক |
চট্টগ্রামে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের অভিযোগ বেড়েই চলেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মসহ নানা অপরাধে সাত বছরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৩ হাজার ৮৩৬ সদস্যকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। চলতি বছরেও অসংখ্য পুলিশের বিরুদ্ধে শৃংখলা ভঙ্গের দায়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এরপরও থামানো যাচ্ছে না পুলিশের অপরাধ কর্মকাণ্ড। সর্বশেষ সোমবার সিএমপির দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র বিক্রির নামে ক্রেতার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মাদক পাচার, সোনার বার ছিনতাই, মামলা ও ডায়েরি করতে টাকা নেয়া, নিরীহ লোকজনকে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, চার্জশিটে অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেয়ার নামে টাকা আদায়, জমির দখল পাইয়ে দিতে সহায়তা করাসহ পুলিশের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগের অন্ত নেই। গত দুই বছরে আদালতে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক লোক মামলা করেছে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এ কারণে অধিকাংশ মামলায় ক্ষতিগ্রস্তরা প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সিএমপি সূত্র জানায়, সাত বছরে (২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত) সিএমপিতে ৩ হাজার ৮৩৬ সদস্যকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর শাস্তি পেয়েছেন ৩০৭ জন, লঘু শাস্তি পেয়েছেন ৩ হাজার ৫২৯ জন। এর বাইরেও শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে ২ হাজার ৬২ সদস্যকে তিরস্কার করা হয়। সতর্ক করা হয় ৭৬৫ জনকে। পিডি (পানিশমেন্ট ড্রিল) ও শ্রমসাধ্য দায়িত্ব দেয়া হয় ৭০২ জনকে। এ সময় ৬২ এসআই (নিরস্ত্র), ৬ সার্জেন্ট, ৩ এসআই (সশস্ত্র), ১৮ এএসআই (নিরস্ত্র), ১৩ এএসআই (সশস্ত্র), ৪ সহকারী ট্রাফিক উপপরিদর্শক (এটিএসআই), ৭ নায়েক এবং ১৯৪ কনস্টেবলসহ ৩০৭ জন গুরুতর শাস্তি পেয়েছেন।

৬ অক্টোবর অস্ত্র বিক্রির সময় র‌্যাবের হাতে নিউমার্কেট থেকে আটক হয় সিএমপির দুই গোয়েন্দা পুলিশ এসআই উজ্জ্বল কান্তি দাস এবং এএসআই আনিসুর রহমান। র‌্যাব অস্ত্রের ক্রেতা সেজে তাদের আটক করে। আটকের পর র‌্যাব তাদের পরিচয় জানতে পারে। পরে তাদের সিএমপির এক কর্মকর্তার হেফাজতে দেয়া হয়। ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় দুই পুলিশ সদস্যকে সোমবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২৭ আগস্ট হাটহাজারী থানার ওসি বেলাল উদ্দিন জাহাঙ্গীর, এসআই মো. খায়রুজ্জামান এবং এসআই আবু বক্কর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন একই উপজেলার পশ্চিম শিকারপুর এলাকার বাসিন্দা সজল আচার্য। চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সোনার বার ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিচার চলছে আদালতে। অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য হলেন : এএসআই মিজানুর রহমান, কনস্টেবল খান এ আলম। তারা কোতোয়ালি থানার এনায়েত বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর তাদের এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এবং চলতি বছরের ১০ মে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ২০ জানুয়ারি বন্দর থানাধীন কলসিদীঘির পাড় এলাকায় সোলায়মান নামে এক ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন ও টাকা আদায়ের অভিযোগে ইপিজেড থানার এএসআই এমদাদুল হককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ইয়াবা পাচার ও ইয়াবা ?দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর অভিযোগে সিএমপির তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ১৮ জানুয়ারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তৎকালীন সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল। অভিযুক্ত তিন পুলিশ হলেন- এসআই শাহাদাত হোসেন, এসআই জুয়েল সরকার ও শেখ সজীব।
ওই বছরের ৪ আগস্ট ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার বাসিন্দা রোজিয়া বেগম। মামলায় আসামি করা হয় পাঁচলাইশ অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার দীপক জ্যোতি খীসা, বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মোহাম্মদ মুহসীন, এসআই কামাল হোসেন ও কনস্টেবল সিরাজুল ইসলাম।

বায়েজিদ থানাধীন সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আহমেদকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এ অভিযোগে গেল বছরের ১৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাস, এসআই একরামুল হক ও সুজন বিশ্বাসকে বরখাস্ত করা হয়। গেল বছরের ৯ জুন নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আমিরুল ইসলাম ও এএসআই জহিরসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য অভিযানের নামে পাঁচলাইশ থানা এলাকার ল্যানসেট ভবনের মালিক ব্যবসায়ী সৈয়দ নাসিম আহমেদের প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর ওই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ৩ জানুয়ারি নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবুল হোসেনসহ ৬ পুলিশ সদস্য ও এক সোর্সের বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ৬০ পিস সোনার বার লুটের অভিযোগে মামলা করা হয়। মামলার অন্য আসামিরা হল : গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল তারেক, আলমগীর, মো. কবির, জসীম উদ্দিন, বাপ্পী আহমেদ ও সোর্স রহিম মেম্বার। নগরীর স্টেশন রোড এলাকায় কৃষ্ণ কর্মকার ও নারায়ণ কর্মকার নামের দুই সোনা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এসব সোনা ছিনতাই করা হয়।

গেল বছরের ১৯ জুন পাঁচলাইশ থানার পুলিশ হেফাজতে বীমা কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামানের মৃত্যুর ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। টাকার জন্য নির্যাতন করে বীমা কর্মকর্তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ৬ পুলিশ সদস্য, আনসার ও পুলিশের সোর্সসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন নিহতের স্ত্রী। মামলায় পাঁচলাইশ থানার এসআই আমির হোসেন, বাকলিয়া থানার এএসআই মো. এনায়েত হোসেন, পাঁচলাইশ থানার কনস্টেবল মিজানুর রহমান, মোছলেম, খোকন মিয়া, পাঁচলাইশ থানার গাড়িচালক কনস্টেবল আকবর, আনসার কনস্টেবল শাহীনুর আলম, পুলিশের সোর্স মো. জামাল ও হুমায়ন কবির এবং ঘটনাস্থলে থাকা হারুনুর রশিদ ডিউককে আসামি করা হয়। সিএমপির এডিসি (মিডিয়া) আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘সিএমপিতে কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ইতিমধ্যে যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

সূত্র যুগান্তর