বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস অবজ্ঞা কিংবা বৈষম্য নয়, প্রতিষ্ঠা হোক দৃষ্টিহীনের অধিকার

.jpg

স্রষ্টার হাজারো সৃষ্টির সমারোহ এ জগৎ। মানব হলো সৃষ্টির সেরা। একমাত্র বিবেক বোধ সম্পন্ন প্রাণী হল মানুষ। বিবেকের ক্ষমতা বলে মানুষ প্রমাণ করতে পারে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসৎ, নৈতিক-অনৈতিক সহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করতে পারে। বিবেকের মাধ্যমে মানুষ অর্জন করে স্রষ্টার আনুগত্য। এবং সিক্ত হয় অসহায়, বিপন্ন ও ভাগ্য বিঢ়ম্বিত মানুষের ভালবাসায়।

আজ ১৫ অক্টোবর, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। দৃষ্টিহীন মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিষ্টল শহরের জেম্স গিবস নামের এক ফটোগ্রাফার র্দূঘটনায় তার দৃষ্টিশক্তি হারান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে অপরের সহযোগীতার প্রত্যাশায় তার পথ চলার সহায়ক লাঠি কে সাদা রঙে রঞ্জিত করেন। ১৯৬৪ সালে ৬ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন কংগ্রেসে সর্বপ্রথম ১৫ অক্টোবর কে বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬৯ সালের কলম্বোয় অনুষ্ঠিত হয় “ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ ইষরহফ (ওঋই)” এর সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে বিশ্বের ৬৯ টি দেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও কর্মরত সংগঠনের সদস্য বর্গের উপস্থিতিতে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যাহা ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতি ক্রমে অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশের সরকার ১৯৯৬ সাল হইতে দিবসটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যেগে রাষ্ট্রীয় ভাবে পালন করে আসছে। আজ জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রে দিবসটি এক যোগে পালিত হচ্ছে। দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে “সাদাছড়ি হোক, আত্ম নির্ভরশীলতার প্রতীক”।

সাদাছড়ি নিরাপত্তা এর শাব্দিক বিশ্লেষণ হলো “সাদাছড়ি” ও “নিরাপত্তা” । সাদাছড়ি হলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতীক, এবং তাদের মুক্ত ভাবে চলার প্রচেষ্ঠা। অন্যদিকে নিরাপত্তা হলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সকল প্রকার অধিকার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ দৃষ্টিহীনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, চিকিৎসা, মত প্রকাশ সহ সকল প্রকার মৌলিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সহ সকল প্রতিবন্ধী স্রষ্টারই সৃষ্টি। মানব বৈচিত্রের অন্যতম দিক। এই সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা এই রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তাদের অধিকার নিশ্চিত করা সমাজের সদস্য হিসেবে আমাদের সকলের।

প্রত্যেক মানুষ পারিবারিক সদস্য হিসেবে যেমন মর্যাদা প্রত্যাশা করে, তেমনি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ও যোগ্য সম্মান কামনা করে। কিন্তু মানুষ যখন নুন্যতম প্রত্যাশা বঞ্চিত হয়, তখন সে মানবিক মর্যাদা হারায়। পরিবারই হল একজন শিশুর প্রথম ও প্রধান আশ্রয়স্থল। পরিবারে জন্মগ্রহণকারী একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর প্রতি ঐ পরিবারের সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি যদি হয় নেতিবাচক, তবে এর চেয়ে কষ্ট, যন্ত্রনার কি অবশিষ্ট থাকতে পারে। বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর প্রতি সামগ্রীক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। আধুনিক সভ্য সমাজের অনেকে এখন ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অন্ধ, কানা ইত্যাদি নামে ডাকতে শুনা যায়। যা তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

সভ্যতার শুরু থেকেই সকল মানব সমাজে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অস্তিত্ব ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাদের প্রতি সমাজ নান ধরণের কু-ধারনা পোষণ করত। প্রাচীন গ্রীসে দৃষ্টিহীনদের বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। গ্রীক সভ্যতার স্পার্টাতে দৃষ্টিহীনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হত। এথেন্সে দৃষ্টিহীন শিশুকে মাটির পাত্রে ভরে রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হতো। ল্যাসিডামোনিয়াতে দৃষ্টিহীন ও বিকলাঙ্গদের গভীর খাদে ছুড়ে দিয়ে হত্যা করা হতো। অন্যদিকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মে অন্ধত্বকে দেবতার অভিশাপ বা পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফল বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রতিবন্ধী হওয়ার বিষয়টি নিজের ইচ্চাকৃত বা কোন কর্মফল নয় বরং জন্মগত বা কোন না কোন র্দূঘটনার ফল। আমাদের দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরতার অন্যতম কারণ হল গর্ভকালীন পরিচর্যা, চিকিৎসা সেবা ও পর্যাপ্ত ভিটামিনের অভাব। তাছাড়া ছানি প্রতিসারণ জনিত সমস্যা, গ্লুকোমা, ভিটামিন এ এর অভাব, ট্রাকোমা, চোখে আঘাত, সংক্রমক রোগ, পুষ্টিহীনতা, আর্সেনিক বিষক্রিয়া’ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক র্দূঘটনা ইত্যাদি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর জীবনকাল অতি কষ্টের , অতি দুঃখের। জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা অতি মাত্রায় অন্যের উপর নির্ভরশীল। মৌল মানবিক চাহিদা পূরণ ও সামাজিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হন। ফলে প্রতিবন্ধীর ব্যক্তির জীবন চক্র দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়। অন্য দিকে নারী প্রতিবন্ধীদের জীবনচিত্র অতি করুণ. অতি বঞ্চনার এবং অতি হতাশার।

বাংলাদেশ সরকার সমাজকল্যাণ বান্ধব সরকার। আমাদের সংবিধান মানবাধিকারের অনন্য অসাধারণ দলিল। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ঘ) এ উল্লেখ “ সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্ব জনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্য জনিত কিংবা অনুরূপ পরিস্থিতি জনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাব গ্রস্থতার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার” নাগরিকের আছে । সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আরো উল্লেখ “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”। তাছাড়া ৩ মে, ২০০৮ সালে জাতিসংঘের ৬১ তম সাধারণ সভায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ সরকার উক্ত সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। এ প্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অনেক কর্মসূচী গ্রহণ করে। দারিদ্র বিমোচন করার জন্য ২০০২-২০০৩ অর্থ বৎসরে প্রবর্তন করা হয় “প্রতিবন্ধী পূর্নবাসন কার্যক্রম” নামে বিশেষ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাত্র ৫% সার্ভিস চার্জ এর বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার জন্য ২০০৫-২০০৬ অর্থবৎসরে প্রবর্তন করা হয় “অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা কার্যক্রম”। এ কর্মসূচীর আওতায় গত বর্ষে ৬ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাঝে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ৩ শত ৬০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ২০০৬-২০০৭ অথ বৎসরে চালু হয় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম। গত বর্ষে প্রাথমিক থেকে ¯œাতক স্তর পর্যন্ত ৬০ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। দেশের প্রত্যেক জেলা ও মহানগরীতে চালু করা হয়েছে মোট ৭৩ টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সহ সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে সমাজে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্টিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ। সামাজিক উন্নয়ন সূচকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশ। অসহায় ও বিপন্ন মানুষের কল্যাণে বর্তমান সরকার অতি সংবেদনশীল। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার প্রবর্তন করে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩”। প্রতিবন্ধীতাকে একান্ত মানবিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় প্রতিবন্ধীতা শণাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচী- ২০১৩। সম্ভবত এটি বিশ্বের প্রথম প্রতিবন্ধী শুমারি। এ কর্মসূচীর অধীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য সমূহ সংরক্ষণ এবং ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে “ উরংধনরষরঃু ওহভড়ৎসধঃরড়হ ংুংঃবস” নামে একটি সফটওয়্যার প্রস্তুত আছে। এ সফটওয়্যারের প্রাপ্ত তথ্য মতে দেশে শণাক্তকৃত মোট প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ১৪,৬৪,৮১৪ জন প্রায়। তৎমধ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ২,০৭,৩০১ জন। যাহা মোট প্রতিবন্ধীর ১৪.১৫%।

দৃষ্টিহীন শিশুর শিক্ষারঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্থানের সাবেক ৪ বিভাগে স্থাপিত হয় চযুংরপধষষু ঐধহফরপধঢ়ঢ়বফ ঞৎধরহরহম ঈবহঃবৎ। উক্ত চঐঞ সেন্টারে ব্রেইল পদ্ধতিতে দৃষ্টিহীন শিশু শিক্ষা গ্রহণ করে আসছে। স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তন করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য “সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম” । এই কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে দেশের সকল জেলার ৬৪ টি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে দৃষ্টিহীন শিশুরা ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করছে। “অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন ফর ওভারসীজ ব্লাইন্ড” এর সহায়তায় দেশে ১৯৬৯ সালে একটি ব্রেইল প্রেস স্থাপিত হয়। যাহা বর্তমানে টংগীতে অবস্থিত। ব্রেইল প্রেসে মুদ্রিত বই সরকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করছে।

সাদাছড়ি দৃষ্টিহীনের প্রতীক। আতœ নির্ভরশীল জীবর পরিচালনার সহায়ক উপকরণ। সাদা রং সহায়তার রূপ। সাদাছড়ি টি আবেদন করছে তার চালক কে সহায়তা করার। অসহায় ও বিপদগ্রস্থ মানুষদের সহায়তার মাঝে মানবের শ্রেষ্ঠত্ব। সষ্ট্রার সকল সৃষ্টি মানুষের সহায়ক। এক অনন্য দৃষ্টান্ত ¯্রষ্টাকে উপলব্ধির। জগতের দূর্দশাগ্রস্থ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিকট উদাহরণ স্বরূপ। মানব সত্তাকে জাগ্রত করা, স্রষ্টার প্রতি অনুগত্য প্রদর্শন এবং মানব জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ¯্রষ্টার অনন্য শৈলী।

সমাজকর্মী হিসেবে আমার লিখাটি ব্রেইল পদ্ধতির লিখা নয়। ছাপার অক্ষরে লিখা। এই লেখা পড়ার ক্ষমতা দৃষ্টিহীনদের নাই। তবে শুনার ক্ষমতা আছে তাদের, শুধুমাত্র মননশীল মানুষের কৃপায়। আমার আবেদন তাদের নিকট যারা সুস্থ সবল সক্ষম মানুষ। যাদের কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে যারা অন্ধ। জয় হোক দৃষ্টিহীন মানুষের।

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
বি.কম (অনার্স), এম.কম (ব্যবস্থাপনা) জাবি,
এম.এস.এস (সমাজকল্যাণ) ঢাবি
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা
নাইক্ষ্যংছড়িা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
আপলাপনী: ০১৮১৮৬৭৪৮৬২