ভারত কেন পাকিস্তানে হামলা চালাল

2_64661.jpg

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। বুধবার রাতে ভারতের এ হামলার জবাবে রণ-হুংকার দিয়েছে পাকিস্তান। গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বাজে সম্পর্কের সময় যাচ্ছে এখন।

কিন্তু এ উত্তেজনাকে ঘিরে এক ধরনের উৎসব শুরু হয়েছে ভারতে। শুধু দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরাই নন, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে সাধারণ ভারতীয়রাও। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী আক্রমণের জবাবে নিরবতা পালন করেছে ভারত সরকার। তাদের বিশ্বাস, পাকিস্তানের শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে বিভিন্ন সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ভারতের লক্ষ্যবস্তুতে এ হামলাগুলো পরিচালনা করে আসছিল। তাই ভারতের এ হামলাকে দাঁত ভাঙা জবাব হিসেবেই দেখছেন তারা।

এ ঝটিকা হামলা আসলে নতুন কিছু নয়। বড় ধরনের কোনো নীতিগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায় না এতে। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর গোড়ার দিকেও সীমান্তে এ ধরনের অভিযান চালিয়েছে ভারত। সাধারণত কোনো হামলার জবাব হিসেবেই দেশটি এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে থাকে।

তবে কাশ্মীর সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় দীর্ঘদিন থেকে ভারতের নিরবতা দেশের জনগণকে হতাশ করে তুলেছিল। অতীতের সঙ্গে এ হামলার মূল পার্থক্য হল, ঘটা করে তা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা। ভারত সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ থেকে এ অভিযানের সফলতা বর্ণনা করা হয়েছে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সাফল্যের প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

কেন এ উদ্যোগ নিয়েছেন মোদি?

এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হল- গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতি। সোজা কথায়, ভোটের রাজনীতি। সম্প্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ১৮ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই প্রতিশোধের দাবি তুলেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। দলটির অন্যতম শীর্ষনেতা এবং মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সরাসরি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করে দেশটির শাস্তির দাবি করেছেন।

তিনি টুইটারে লিখেছেন, ‘পাকিস্তান একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। একে কালো তালিকাভুক্ত করা হোক এবং একঘরে করে দেয়া হোক।’ ভারতের কূটনীতিক, সেনা কর্মকর্তারা ও সংবাদ উপস্থাপকরাও পাকিস্তানকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়ার দাবি তুলেছিলেন।

নাগরিক চাপের কারণেই মোদি অভিযান চালানোর উৎসাহ পেয়েছেন এবং পরে সফলতার বার্তা নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছেন। সব ইস্যুতে বিরোধিতাকারী প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পর্যন্ত এবার সরকারের ভূমিকাকে সমর্থন করেছে। রাজনৈতিকভাবে এর ফসল ঘরে তুলবেন মোদি।

পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের উচ্চাকাক্সক্ষা

এর আগে আফগানিস্তানকে অ্যাটাক হেলিকপ্টার প্রদান ও মিয়ানমার সীমান্তে সন্ত্রাস দমনে সফল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালায় ভারতীয় সেনারা। এশীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চায় ভারত।

এছাড়াও মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার বোঝাতে চায় যে, আক্রমণ করাটাকে তারা গতানুগতিক অভ্যাস বানিয়ে ফেলবে না। এজন্য এ বছরের জানুয়ারিতে তাদের একটি বিমান ঘাঁটিতে হামলার পরও সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু ভারতকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি পাকিস্তান। এরপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ভারতের নীতিনির্ধারকরা। সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারতের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে তারা প্রয়োজনে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির প্রচেষ্টা

নিয়ন্ত্রণরেখায় হামলা চালিয়েও যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছে ভারত। বড় পরিসরে যুদ্ধে না গিয়ে শুধু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালিয়ে প্রতিবেশীদের কাছেও নিজের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রেখেছে।

এদিকে সন্ত্রাসাবাদকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলনে যোগদান না করার জন্য অনেক সদস্য রাষ্ট্রকে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে তারা। এর ফলে আঞ্চলিকভাবেও একা হয়ে পড়বে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানকে দমানোর ক্ষেত্রে ভারত যত উল্লাস প্রকাশ করবে, পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান ততই ঔদ্ধত্যভাবে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে চাইবে। ফলে আগামী কিছুদিন দক্ষিণ-এশিয়াঞ্চলে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।