প্রথম বিতর্কে হিলারির কাছে ধরাশায়ী ট্রাম্প

1_63829.jpg

অনলাইন ডেস্ক |
প্রথম টেলিভিশন বিতর্কে পরস্পরকে বাক্যবাণে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিতর্কের শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রসঙ্গে। এ বিষয়ে প্রথমে হিলারি তার বক্তব্য তুলে ধরেন। এরপর কথা বলেন ট্রাম্প। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অভিবাসন নীতি, বর্ণবাদ, নিরাপত্তা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসবাদ, ইরাক যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি এবং চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিতসহ নানা বিষয়। এ সময় হিলারির ই-মেইল কেলেংকারি নিয়ে আক্রমণ করেন ট্রাম্প এবং ট্রাম্পের ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল না করার মতো ব্যক্তিগত আলোচিত বিষয় নিয়ে কথা বলেন হিলারি।

সোমবার রাতে (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা) নিউইয়র্কের হেম্পস্টেডে হোফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাম্প ও হিলারির মধ্যে ৯০ মিনিটের এ বিতর্ক শুরু হয়। তাদের এ নির্বাচনী বিতর্ককে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের ইতিহাসে ‘সর্বকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক’ বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। বিতর্ক শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ৫২১ জন দর্শকের মধ্যে জরিপ চালায় সিএনএন/ওআরসি। এতে অংশ নেয়া দুই-তৃতীয়াংশ নিবন্ধিত ভোটার জানান, হিলারি তার বক্তব্য ট্রাম্পের চেয়ে যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। জরিপ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ মনে করেন হিলারি জয়ী হয়েছেন। আর মাত্র ২৭ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। সিএনএন জানায়, ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত এ ধরনের বিতর্কে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনি ও বারাক ওবামার মধ্যেও পার্থক্য একই রকম ছিল। হিলারি-ট্রাম্পের বিতর্ক সাতসকালে দেখেছেন অনেক বাংলাদেশী।

বিতর্কে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের (ইসলামিক স্টেট) বিস্তার ঘটেছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর উদ্দেশে তিনি বলেন, যখন এটি ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী ছিল তখন আপনি মন্ত্রী হন, আর এটি এখন ৩০টির বেশি দেশে বিস্তৃত, আপনি একে থামাতে পারবেন বলে আমি মনে করি না।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করে বলেন, ক্ষমতায় গেলে আইএসকে পরাজিত করতে ইরাকের সব তেল তুলে নেয়া হবে। উত্তর কোরিয়াকে থামাতে চীনের সাহায্য নেয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করেন রিপাবলিকান প্রার্থী। কয়েক সপ্তাহ আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হিলারি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের মতো ‘শারীরিক সক্ষমতা’ রাখেন কিনা, সে প্রশ্নও তোলেন ট্রাম্প।

অন্যদিকে হিলারি তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর মধ্যে থাকা ‘বর্ণবাদ’ দমনে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।৯০ মিনিটের ওই বিতর্ক নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই প্রার্থী পরস্পরকে লক্ষ্য করে আক্রমণের চেষ্টাই বেশি করেছেন। তারা পরস্পরের বক্তব্যের মাঝেই অন্যজনকে থামিয়ে পাল্টা জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বিতর্ক নির্ধারিত বিষয়বস্তু ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণেও রূপ নেয়।

হিলারি ক্লিনটনের প্রতি উপহাস করে ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার যথেষ্ট ধৈর্য তার নেই। অন্যদিকে হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আয়করের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনেন। পাল্টা জবাব দিয়ে ট্রাম্প বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ৩৩ হাজার ই-মেইল তিনি প্রকাশ করলে তিনিও তার আয়কর বিবরণী প্রকাশ করবেন।

হিলারি বলেন, তিনি ই-মেইলসংক্রান্ত তার ভুলের কোনো অজুহাত দিতে চান না এবং সেই কাজের দায়িত্ব¡ তিনি বহন করেন। হিলারি ক্লিনটনকে ব্যঙ্গ করে ট্রাম্প বলেন, আপনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকেই আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। জবাবে হিলারি বলেন, আপনি তো মেয়েদের শূকর, অলস আর কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ সময় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ তোলেন তিনি।

রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের প্রশংসা করে দেয়া ট্রাম্পের বক্তব্যের জের ধরে হিলারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে হ্যাকিং করার জন্য প্রকাশ্যে পুতিনকে তিনি যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেটা দেখে আমি হতবাক হয়েছি। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে যোগ্য নন বলেও প্রশ্ন তোলেন হিলারি।

কর্মসংস্থান নিয়ে হিলারি বলেন, জনগণ আমাদের পরিকল্পনার দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা এক কোটি কর্মসংস্থান করতে চাই। কিন্তু আপনার (ট্রাম্প) পরিকল্পনায় ৩৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। বিতর্ক শেষে সিএনএনের জরিপে উঠে এসেছে, উদ্বিগ্ন ভোটারদের ৫৭ শতাংশকে হিলারি প্রভাবিত করতে পেরেছেন। আর ট্রাম্প পেরেছেন ৩৫ শতাংশকে প্রভাবিত করতে। জরিপে অংশ নেয়া ৫৬ শতাংশ মত দেন হিলারি ‘শক্তিশালী নেতা’; ট্রাম্প এ ভোট পান ৩৯ শতাংশ।

বিতর্কে হিলারি ট্রাম্পকে ঘায়েল করতে চেয়েছেন জাতিগত বিদ্বেষ, লিঙ্গ বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কর খেলাপের মতো অভিযোগ এনে। অন্যদিকে আবাসন ব্যবসায়ী ট্রাম্প তার প্রতিপক্ষের মন্ত্রিত্বের দিনগুলোতে কাজের সমালোচনা করেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে হিলারির আন্তরিকতা নিয়ে। তবে ট্রাম্প বলেন, কর পরিশোধ না করা আমাকে স্মার্ট করেছে। বিতর্কে দুই প্রার্থীর মধ্যে কাকে বেশি আন্তরিক ও খাঁটি মনে হয়েছে, এমন প্রশ্নের জরিপে অংশ নেয়া ৫৩ শতাংশ দর্শকের রায় পেয়েছেন হিলারি। ট্রাম্পকে ৪০ শতাংশ এ রায় দেন। তবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ক্ষেত্রে ট্রাম্প হিলারিকে ছাড়িয়ে গেছেন। ৫৬ শতাংশ দর্শকের মতে, প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে ট্রাম্প বেশি সময় দিয়েছেন। হিলারির প্রতি এ সমর্থন ৩৩ শতাংশের। তবে নিরপেক্ষ দাবি করা ভোটাররাও বিতর্ক শেষে হিলারিকে বিজয়ী হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের ৫৪ শতাংশ হিলারিকে, ৩৩ শতাংশ ট্রাম্পকে জয়ী বলে মনে করেন।

বিতর্কে হিলারি ‘আশাতীত ভালো’ করেছেন বলেও জরিপে উঠে এসেছে। তবে জরিপে অংশ নেয়া ৪৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, এ বিতর্ক তাদের ভোটে প্রভাব ফেলবে না। ৩৪ শতাংশ বলছেন, বিতর্ক শেষে তারা হিলারিকে পছন্দ করা শুরু করেছেন। ১৭ শতাংশের সমর্থন ট্রাম্পের দিকে ঘুরেছে। পুরো বিতর্ক দেখেছেন এমন ভোটারদের ৬২ শতাংশ বলছেন, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে হিলারিকে ট্রাম্পের চেয়ে বেশি দক্ষ বলে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন মাত্র ৩৫ শতাংশের।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় হিলারির নীতির প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেয়া ৫৪ শতাংশ ভোটার। তবে ৪৩ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্পের হাতেই বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস দমন সম্ভব। অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাদের পার্থক্য অবশ্য বেশ সূক্ষ্ম। এ বিষয়ে ৫১ শতাংশ হিলারিকে আর ৪৭ শতাংশ ট্রাম্পের প্রতি তাদের পছন্দের কথা জানান। ৫৫ শতাংশই ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ‘অযোগ্য’ বলে মনে করেন। ৪৩ শতাংশ মনে করেন, এ পদের জন্য ট্রাম্পই উপযুক্ত। ৪৯ শতাংশ নিরপেক্ষ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে অযোগ্য, বিপরীত রায় ৫০ শতাংশের।

৬৭ শতাংশ দর্শক ট্রাম্পের ওপর হিলারির আক্রমণ এবং রিপাবলিকান প্রার্থীর বিরুদ্ধে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা মেনে নেন। হিলারির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের করা বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা সমর্থন করেন ৫১ শতাংশ ভোটার। এনবিসি টিভির লেস্টর হল্ট বিতর্ক সঞ্চালনা করেন। চূড়ান্ত ভোটের আগে আরও দুটি বিতর্কে দেখা যাবে হিলারি ও ট্রাম্পকে।

প্রথম বিতর্কে জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, আবাসন, ট্রাম্পের ব্যবসা, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ- এসব প্রসঙ্গ উঠে আসে। সিএনএনের যাচাই দলের পর্যালোচনায় এসব ইস্যুতে হিলারির বক্তব্যের সত্যতাই বেশি। ট্রাম্প বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উল্টোপাল্টা বলেছেন।

বিতর্কের সময় ট্রাম্প ছিলেন খামখেয়ালি, সামঞ্জস্যহীন এবং অসংলগ্ন। তিনি পুরো বিতর্ককালে আইনশৃংখলা ছাড়া আর কোনো ইস্যুতেই তার বক্তব্যকে মনে রাখার মতো কিছুই করতে পারেননি। বিতর্কের পর নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক লেখায় এভাবেই দু’প্রার্থীর পারফর্মেন্স মূল্যায়ন করেন থমাস বি এডসাল। থমাস লেখেন, বিতর্ককালে ট্রাম্প তার ট্যাক্স রিটার্ন প্রকাশ না করার বিষয়টি যৌক্তিক করতে গিয়ে দাবি করেছেন, আমার সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ হল আমার মেজাজ। তিনি তার দেউলিয়াত্ব, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, ধনীদের ট্যাক্স কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বিশৃংখল অবস্থায় থাকা সম্পর্কে যা বলেছেন তার সবকিছুতেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে বিতর্ককালে হিলারি ছিলেন সুসঙ্গত এবং তথ্যভিত্তিক। তার বক্তব্যের সুন্দর দিকটি হল দর্শকরা সহজেই তার কথা বুঝতে পেরেছেন। হিলারিকে খালি কলসি বেশি বাজে, কাজের বেলায় ঠনঠনাঠন বলে কটাক্ষ করেন ট্রাম্প। কিন্তু এ মন্তব্য ট্রাম্পের বেলাতেই বেশি প্রযোজ্য। বিতর্কে হিলারি আইএস থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্র, সাইবার নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত থাকলেও ট্রাম্পকে এ ধরনের ইস্যুর জন্য অপ্রস্তুত মনে হয়েছে।

থমাস লেখেন, এ বিতর্কের ব্যাপারে রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন কয়েকজনের ভাবনা জানতে চাই আমি। তাদের মধ্যে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের স্কলার নরম্যান অর্নস্টেইন ই-মেইল জানান, বিতর্কের সময় ট্রাম্পকে রাগী, উদ্ভ্রান্ত, অস্থির এবং বেশিরভাগ সময় অসংলগ্ন মনে হয়েছে। তার জন্য বড় বাধা হল তার মধ্যে প্রেসিডেন্টসুলভ বিনয়, মেজাজের ভারসাম্য এবং মৌলিক জ্ঞানের স্বল্পতা।

‘বাকযুদ্ধ’ দেখলেন ১০ কোটি মার্কিনি : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হিলারি-ট্রাম্পের বিতর্ক উপভোগ করেছেন সে দেশের প্রায় ১০ কোটি জনগণ। নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি দল তাদের পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, প্রায় ১০ কোটি মার্কিন নাগরিক ওই বিতর্ক টেলিভিশন অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে সরাসরি দেখেছেন। তারা এটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা বলেও দাবি করছেন।