উখিয়ায় রোহিঙ্গা জঙ্গীরা ফের তৎপর

is-libya_232662-1.jpg

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া |
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জঙ্গীরা ফের তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ শিবিরটি ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবেও। শুধুমাত্র দেশী নয় বিদেশী জঙ্গীদের কানেকশনও রয়েছে এ শিবিরে। কক্সবাজার সদরের আদালত পাড়ায় তালেবান মামলা হিসেবে পরিচিত হরকাত-উল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)’র ৪১ জন জঙ্গীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল তাদের সবাই এ শিবির সংলগ্ন পালংখালী ইউনিয়নের লন্ডাখালী এলাকায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময়ই আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। এ কারনেই যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক হুজি জঙ্গীদের সঙ্গেও রয়েছে রোহিঙ্গা শিবির কানেকশন। ১৯৯৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী দুপুরে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়া-উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের লন্ডাখালী নামের পাহাড়ী গুহায় সশস্ত্র প্রশিক্ষন দেওয়ার সময়ই পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মীদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল ৪১জন জঙ্গী। লন্ডাখালী পাহাড়ী গুহাটি কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরেরই পার্শ্ববর্তী। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও আফগানিস্তান থেকে তালেবান জঙ্গী প্রশিক্ষকগণ সে সময় এসেই লন্ডাখালীর পাহাড়ী গুহায় বাংলাদেশী তালেবানী হুজি জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দিত। ১৯৯২ সালে সর্বশেষ দফায় মিয়ানমার আরকান থেকে আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী এ দেশে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগকে যথারীতি কাজে লাগায় আর্ন্তজাতিক জঙ্গী গোষ্ঠি। অভিযোগ রয়েছে ওই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বে থাকা হট্টর মৌলবাদী হিসেবে পরিচিত এক সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত উপায়ে আরকান থেকে এপারে দলে দলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসা। আর রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার নাম দিয়ে দলে দলে সীমান্তে জড়ো হতে শুরু করে নানা ইসলামী সংস্থার ব্যানার টাঙ্গিয়ে যাত্রা শুরু হয় জঙ্গীদের। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াকু ভূমিকা থেকে শুরু করে রক্তাক্ত আফগান যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উগ্রধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি করতে থাকে জঙ্গীরা। উখিয়া-টেকনাফ, রামু, চকরিয়া থেকে শুরু করে বান্দরবানের অরন্যঘেরা সীমান্ত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ঘটায় জঙ্গীরা তাদের কার্যক্রম। পাহাড়ের পাদদেশ এবং অরন্যে স্থাপন তাদের প্রশিক্ষণ শিবির। এসব শিবিরে যোগ দিতে শুরু করে রোহিঙ্গারাও। কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য পাঠানো হয় আফগানিস্তানে। তালেবানী জোসে টইটম্বুর যুবকদের ফিরিয়ে আনা হয় আবার এ দেশে। তাদের সঙ্গে মিলি-মিশে কাজ করে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী মৌলবাদী সংগঠন আরএসও, আরএনও এবং আরআইএফ সহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। ১৯৬৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী কক্সবাজারের উখিয়ায় গ্রেপ্তারকৃত ৪১জন তালেবানী হুজি জঙ্গী সদস্যদেরও এখানকার প্রশিক্ষন শেষে পাঠানো হতো আফগানিস্তানে। কিন্তু এর আগেই তারা ধরা পড়ে যায়। এ সময় ৪টি বিশাল তাবুও টাঙ্গানো ছিল সেখানে। এসব তাবুতে অবস্থান নিয়েছিল আরও বিপুল সংখ্যক তালেবানী হুজি সদস্য। পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মীদের অভিযানের সময় তাদের অনেকেই পালিয়ে যায়। এ সময় প্রশিক্ষণ উদ্ধার করা হয় ৮টি অত্যাধুনিক বন্দুক, গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গুলি, ক্যামেরা, বাইনুকুলার, সামরিক পোষাক, পরচুলা, তালেবানী মুজাহিদ প্যান্ট, ১০টি ছোরা, জিহাদ লেখা পতাকা সহ ২৭ প্রকারের অন্যান্য সামগ্রী। যা মামলায় আলামত হিসেবে জব্দ দেখানো হয়। কক্সবাজার স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল আদালতে ট্রাইবুন্যাল মামলা নং- ১০০/৯৬। স্বাক্ষ্যসাবুদ নিয়ে ১৯৯৮ সালের ৩মে সে সময়কার জেলা ও দায়রা জজ এবং ট্রাইবুন্যাল কোর্টের বিচারক মোঃ আবদুল গফুর এ রায় ঘোষনা করেছিলেন। মামলার রায়ে একজন মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা সহ মোট ৪১জন জঙ্গীকে অস্ত্র আইনে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে সে সময় ব্যারিষ্টার কোরবান আলী সহ জামায়াত সমর্থিত আইনজীবিরাই কক্সবাজার আদালতে জঙ্গীদের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য আসতেন। ২০০৯ সালের ১আগষ্ট শনিবার কারাদন্ডিত ৪জন হুজি সদস্য র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় তারাও কক্সবাজারের তালেবানী মামলায় দন্ডিত জঙ্গী। । উখিয়ার থাইনংখালী গ্রামের মৌলভী জাকির হোছনের ছেলে জঙ্গী মৌলভী রফিক উদ্দীনসহ ৪১জন জঙ্গী জোট সরকারের সময় জামিনে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে পলাতক থাকলেও কিন্তু তাদের কার্যক্রম গোপনে চলছে। এসব পলাতক জঙ্গী বর্তমান সময়ে বিপদজ্জনক বলে আইন শৃংখলাকারী বাহিনীর সদস্যরা মনে করছেন। এ জন্যই তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ওই সময় গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছিল জঙ্গী শায়খ আবদুর রহমান ও মুফতি হান্নান থেকে শুরু করে জঙ্গীদের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা সবাই কক্সবাজারের সীমান্তের সেই সময়কার তালেবানী প্রশিক্ষন ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সেই থেকেই জঙ্গীদের রয়েছে রোহিঙ্গা কানেকশন। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বান্দরবানের অরন্য থেকে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র ঘাটি বাংলাদেশের তৎকালীন বিডিআর ও সেনা কর্তৃক গুড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে তারাও আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরে। এই মৌলবাদী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশের হুজি, হেফাজত জঙ্গীদের সখ্যতা রয়েছে। তারা একই সঙ্গে সীমান্ত এবং আফগানিস্তানে প্রশিক্ষন নেওয়ার বরাবরই যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এসব কারনেই জঙ্গীদের নিরাপদ আস্থানাটি গড়ে উঠেছে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। তদপুরি উক্ত রোহিঙ্গা শিবিরটি পরিচালিত হয়ে আসছে সদ্য কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন আরএসওর সামরিক উপদেষ্টা জঙ্গী নেতা হাফেজ ছালাউল ইসলামের অর্থায়নে ও সহযোগিতায় এবং শতাধিক রোহিঙ্গা নেতা নিয়ে গঠিত একটি ক্যাম্প কমিটির সাহায্যে। আর এ সুযোগে জঙ্গীদের তৎপরতা বেড়ে গেছে শিবিরের অভ্যন্তরে। রোহিঙ্গা শিবিরের আবু ছিদ্দিক ওরফে জঙ্গী ছিদ্দিক, নুর মোহাম্মদ, মনিরুজ্জামান, হাফেজ জালাল, মাষ্টার ইকবালের সহযোগিতায় আনঃরেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গাদের মাঝে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর সহযোগিতায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে এসে সম্প্রতি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল জঙ্গী ছালাউলের সহযোগি আবু তাহের সহ ৩জন বিদেশী নাগরিক। সম্প্রতি কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পের এক মহিলার বাসার সামনে থেকে পুলিশ বিদেশী বন্দুক এসএমজির ৬রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছিল। ২০০৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার গভীর রাতে বহিরাগত রোহিঙ্গা শিবিরে দু’জন জঙ্গী ক্যাডারকে ক্যাম্প পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। এরা হচ্ছেন বহিরাগত রোহিঙ্গা মৃত আবু বক্করের ছেলে আবদুস শুক্কুর (৪০) ও কক্সবাজরের ঈদগাও জালালাবাদ গ্রামের মৃত আহমদ হোছনের ছেলে শামশুল আলম (৩২)। পুলিশ এদের দেহ তল্লাশি করে ৩টি পাসপোর্ট, ভারুয়াখালী ইউপির সনদ পত্র, টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিকত্ব সনদপত্র, ঈদগাও ইসলামি ব্যাংকের চেক বই ও মোবাইল উদ্ধার করেছিল। উদ্ধারকৃত মোবাইলে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান সহ বিভিন্ন দেশের মোবাইল নাম্বার ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে সাড়াশি অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গীমুক্ত করার দাবী জানান। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ শাকিল আরমান বলেন, ক্যাম্পের চারপাশে ঘেরাবেড়া না থাকায় কোন সময়ে কে আসে আর যায় সেটা আমার জানা নেই। উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের বলেন, জঙ্গীদের সঠিক তথ্য পেলে গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি হেফাজত ইসলামের ঢাকায় কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় এবং কক্সবাজারে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী মুক্তি পরিষদের ডাকা বিক্ষোভ মিছিলে অংশ গ্রহণ করতে যাওয়ার সময় ২শতাধিক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করেছিল পুলিশ। এ ব্যাপারে থানায় মামলাও রুজু করা হয়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজার সরকারী কলেজের পেছনে মুহুরী পাড়া গ্রামে অবস্থিত ইসলামী সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গনাইজেশনের সামরিক উপদেষ্টা জঙ্গী নেতা হাফেজ ছালাউল ইসলামের অর্থায়নে কুতুপালং ক্যাম্পে সাড়ে ৩শতাধিক জঙ্গী ক্যাডারদের নিয়ে ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ছৈয়দ আলম মাঝি, লালু মাঝি, আবু তাহেরসহ ডজন খানেক রোহিঙ্গা জঙ্গীর নেতৃত্বে ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণ করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ওই রোহিঙ্গা জঙ্গীদের লালন পালন করতে জঙ্গী নেতা হাফেজ ছালাউল ইসলাম বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা আনছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।