বিতর্কিত চেম্বারই প্রতিনিধিত্ব করছে

teknaf-pic-001.jpg

ফাইল ছবি

আজ রাখাইন স্টেট চেম্বার ও কক্সবাজার চেম্বারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

সিবিএন:

মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারাধীন মামলায় মহেশখালীর ছালামত উল্লা খানের নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের কমিটি অবৈধ। ২০১৫ সালে কক্সবাজার চেম্বার সভাপতি মো: আলীর করা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ওই কমিটিকে অবৈধ উল্লেখ করে এফবিসিসিআই নির্বাচনে ভোটার তালিকা থেকে কমিটির প্রতিনিধিদের নাম বাতিলের রুল জারি করেন। হাইকোর্টের বিচারপতি নাজমা হায়দার এবং বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চে ওই রুল জারি করা হয়। এরপর থেকে বিষয়টির আর কোন নিষ্পত্তি হয়নি।

ফলে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে কারাগারে অন্তরীণ ছালামত উল্লা খানের নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের অবৈধ কমিটির ধারাবাহিকতায় আসা হুমায়ুন কবির বাবু এবং আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার কমিটিও অবৈধ। এ ছাড়া উল্লিখিত বিতর্কিত ব্যক্তিদ্বয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত চেম্বারটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত নয়। এখনো মো. আলীর নেতৃত্বাধীন নিবন্ধিত সংগঠনটি নিজেদের বলে দাবি করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাসিল করছে। এই দাবি করছেন মো. আলীর নেতৃত্বাধীন চেম্বারের নেতৃবৃন্দ। আর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক ছালামত খানের অংশের চেম্বারের পরবর্তী এই অবৈধ কমিটিই আজ ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে শহরের বিলাসবহুল হোটেল ওশান প্যারাডাইজে অনুষ্ঠিতব্য মায়ানমারের রাখাইন স্টেট চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’র সাথে কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’র মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কক্সবাজারের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করবে। আজকের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন।

বিষয়টি জানার পর থেকেই ফুঁসে উঠেছেন জেলার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়সহ সুধীজনেরাও। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের শক্তি থেকেই আসছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। সকলেই বলছেন, যুদ্ধাপরাধীর প্রেতাত্মা, তাদের বংশধর যারা এখনো মন থেকে এদেশকে মেনে নিতে পারেনি- তাদেরকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটি বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে দেয়া মানে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের উৎসাহ দেয়া। তাঁরা অবৈধ কমিটির নেতৃবৃন্দকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব না করাতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান। বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের কক্সবাজারে আসার সংবাদটি পড়ার পর পরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেস্বুকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, জেলায় কী আর কোন মানুষ নেই? যাঁরা ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখেন।

আজকের মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদলের সাথে কক্সবাজার চেম্বারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের নেতৃত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উইং (নৌ) এর সহকারি সচিব পারুল দেওয়ান স্বাক্ষরিত একটি পত্রে চেম্বার সভাপতিকে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নেতৃত্ব দিতে বলা হয়। তবে, ওই চিঠিতে কারো নামোল্লেখ করা হয়নি। ফলে মো. আলীর নেতৃত্বাধীন চেম্বার কমিটির নেতৃবৃন্দ বলছেন, আজকের বৈঠকে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন সেটি নির্ভর করবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উপর।

জেলার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বুঝতে পারছেন না, কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’র প্রকৃত কমিটি কোনটি। যদিও সর্বোচ্চ আদালতের রিট আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো মো. আলী-ই চেম্বার সভাপতি। গত কয়েক বছর ধরে জেলার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় রয়েছেন বেশ বিপাকে। ত্রিধাবিভক্ত চেম্বারের প্রকৃত নেতৃত্ব নিয়ে সকলেই বিব্রতকর অবস্থায়। এর একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন কক্সবাজার চেম্বারের দীর্ঘদিনের সভাপতি মো. আলী, একটি গ্রুপ চলে যায় মানবতা বিরোধী অপরাধে বিচারাধীন ছালামত উল্লাহ খান এবং আব্দুস শুক্কুরের নেতৃত্বে গঠন করা হয় আরো একটি চেম্বারের কমিটি। যদিও প্রথম দিকে মো. আলী এবং ছালামত উল্লা খানের নেতৃত্বে জেলায় দু’টি চেম্বার কমিটি ছিল। পরবর্তীতে ছালামত খানের পক্ষ থেকে আব্দুস শুক্কুর ও রইস উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং হুমায়ুন কবির বাবু ও আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার নেতৃত্বে গঠন করা হয় আরো একটি কমিটি।

ইতোমধ্যে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন আব্দুস শুক্কুর। এরপর কিছুদিন ওই কমিটির প্রথম সহ-সভাপতি রইস উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন। বর্তমানে সেই চেম্বার কমিটির কোন কর্মকা- আপাতত দৃশ্যমান নয়। চেম্বারের একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জানান, চেম্বার এর অপর অংশের সভাপতি সভাপতি ছালামত উল্লা খান মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ার আগে থেকেই তিনি ভাবশিষ্য হুমায়ুন কবির বাবু ও আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার হাতে চেম্বারের তার (ছালামত খানের) অংশের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধী ছালামত খান চেম্বার সভাপতির দায়িত্ব পেয়েই লুটপাটে উঠে পড়ে লাগেন। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’র কার্যালয়ের জমি কেনার জন্য এফবিসিসিআই’র পক্ষ থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকে সেই টাকা আত্মসাত করতে উঠে পড়ে লাগেন তৎকালীন সভাপতি ছালামত উল্লা খান। এক পর্যায়ে জাল বায়নানামা দলিল তৈরির মাধ্যম ব্যাংক থেকে সেই টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে চেম্বার সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে যা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত গড়ায়। দুদক’র পক্ষ থেকে সংস্থাটির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক মোঃ মনিরুজ্জামান আত্মসাত ঘটনার তদন্তে নামলেও অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি বেশিদূর এগোয়নি।

উল্লেখ্য ইতিপূর্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে দেশের যে কোন চেম্বার সভাপতি পরপর দু’বারের অধিক সময় নির্বাচিত হতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর তৎকালীন সভাপতি মো. আলী প্রথম সহ-সভাপতি ছালামত উল্লা খানকে সভাপতির দায়িত্বভার ন্যস্ত করেন। এরপর থেকেই ঘোলাটে হতে থাকে চেম্বারের পরিবেশ। কোন ধরনের নির্বাচন নয়। হোটেলের কক্ষে বসেই গঠন করা হয় বিতর্কিত চেম্বার কমিটি। যদিও বিতর্কিত চেম্বার কমিটি দুটোর কোনটিই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত নয়।