বনানীর ‘ডন’ সুন্দরী সোহেল

sohel_25251_1474140408.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক |
‘সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেল। বয়স পঁচিশ বছর। উচ্চতা চার ফুট আট ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা। মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারী। একাধিক মামলার আসামি।’

র‌্যাবের অপরাধী তালিকায় (ক্রিমিনাল ডাটাবেজ) একটি ছবির নিচে এমন পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। স্ট্যাটাস হিসেবে বলা আছে ‘ওয়ান্টেড’। দুর্ধর্ষ এই তরুণই যুবলীগের নেতা ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেল। তিনি রাজধানীর বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক। যাকে অনেকে বনানীর ডন হিসেবেও চেনেন। নামের সার্থকতার পরিচয় তিনি প্রায় দিয়ে থাকেন। তবে এবার একটু ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রিকশা ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডার জের ধরে এক হতদরিদ্র রিকশাচালককে গুলি করেন তিনি। এ ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করে বনানী থানা পুলিশ। অবশ্য শনিবার তিনি জামিনে মুক্তি পান। সমালোচকরা বলছেন, সরকারি দলের পরিচয় থাকায় তিনি এবারও কি পার পেয়ে গেলেন?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃংখলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সোহেল অস্ত্র ছাড়া চলাফেরা করেন না। লাইসেন্স করা অত্যাধুনিক শর্টগান ও বিদেশী পিস্তল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এ কারণে তাকে লাইসেন্সধারী সন্ত্রাসী বললেও ভুল বলা হবে না। অস্ত্র ছাড়াও তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী রয়েছে, যে বাহিনী দিয়ে তিনি রাজধানীর গুলশান, বনানী ও মহাখালী এলাকায় টেন্ডার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা করে আসছেন। মদ্যপান করে গুলশান-বনানী ও মহাখালী এলাকায় হট্টগোল ও তাণ্ডব চালানো তার পুরনো অভ্যাস। মাতাল অবস্থায় যাকে তাকে গুলি করাও তার অন্যতম শখ। কিন্তু এবার রিকশাচালককে গুলি করে তিনি গণরোষে পড়ে যান। কোনো মতে একটি আবাসিক হোটেলে ঢুকে পড়ে আত্মরক্ষা করেন।

যেভাবে উত্থান : পুলিশের খাতায় অপরাধী হিসেবে সুন্দরী সোহেলের নাম তালিকাভুক্ত হয় ২০০৫ সালে। এ সময় বাড্ডার ফোর মার্ডারের ঘটনায় সোহেলের নাম সামনে চলে আসে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন রাজধানীর অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী আলামিন ওরফে আলা। আলা নিহত হওয়ার পর পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়ের মুখে সোহেল সাউথ আফ্রিকায় পালিয়ে যান। সেখানে টানা চার বছর পলাতক থাকার পর তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেই রাতারাতি হিরো বনে যান। কারণ, এলাকার একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার বডিগার্ড হওয়ার সুযোগ পান। আর তাকে পায় কে। সময়টা ছিল ২০০৯ সালের মাঝামাঝি। আওয়ামী লীগ সরকারের যাত্রা শুরু। সরকারি দলের হাইপ্রোফাইল নেতার বডিগার্ড বলে কথা। কাউকে যেন পরোয়া করেন না তিনি। এভাবে শক্ত খুঁটির জোরে বছর না যেতেই অনেকটা বেসামাল হয়ে ওঠেন সুন্দরী সোহেল। ওই সময় যুবলীগ উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক লিটন দলীয় কোন্দলের জের ধরে খুন হন। নেতৃত্ব শূন্যতার সুযোগে সোহেল রাতারাতি যুবলীগ নেতা বনে যান। ২০১১ সালে বনানী থানা গঠিত হলে সোহেলের ভাগ্য খুলে যায়। নবগঠিত বনানী থানা যুবলীগের কমিটিতে জায়গা পেয়ে যান তিনি। থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি করা হলে সেখানে যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পান সোহেল। এরপর থেকেই তিনি নিজেকে বনানী এলাকার অন্যতম দাপুটে খলনায়ক হিসেবে আবিষ্কার করেন।

২০১৩ সালে মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থিত যুবলীগের অফিসে দিনদুপুরে যুবলীগ নেতা জাকিরকে উদ্দেশ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। এ ঘটনায় জাকির গুরুতর আহত হন। এ মামলায় সোহেল ছিলেন এক নম্বর আসামি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টাও করেনি। শুধু পুলিশের আশীর্বাদ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা মাথায় নিয়েও অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে সক্ষম হন তিনি। অস্ত্র হাতে পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সোহেল। তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে ২০১৪ সালে তেজগাঁওয়ে ‘রাজনৈতিক গোলাগুলির’ ঘটনা ঘটে। ‘গরম মাথায়’ তেজগাঁও থানা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিটনকে গুলি করে বসেন সুন্দরী সোহেল। মহাখালী বন ভবনের সামনে গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে। তবে সোহেলের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় গত বছর বনানীর এক হকার নেতার দুই মেয়ে নিখোঁজের ঘটনায়। মহাখালী জলখাবার হোটেলের পেছনের হকার্স মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক আওলাদের দুই মেয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। নানা জায়গায় খোঁজখবরের এক পর্যায়ে পুলিশ সোহেলের বাসায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে আওলাদের দুই মেয়েকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় আওলাদ মামলা করতে পারেননি। থানায় দীর্ঘ সালিশ বৈঠকের পর নেতাদের সিদ্ধান্তে আওলাদ এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করেননি।

এখানেই শেষ নয়। গত রোজার ঈদের তিন দিন পর মহাখালী একাদশ ক্লাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সশস্ত্র তাণ্ডব চালায় সোহেলের লোকজন। কারণ ওই অনুষ্ঠানে সোহেলকে অতিথি করা হয়নি। হট্টগোলের সময় ঘটনাস্থলে বনানী এলাকার তিনজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন বাবুল, নাসির ও মফিজ কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারাও সোহেলকে নিবৃত্ত করতে পারেননি।

হট্টগোলের একপর্যায়ে কমিশনারদের উদ্দেশ্য করেও এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করেন সোহেল। তার লোকজন টেনেহিঁচড়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়।

চলতি মাসেই মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে কোরবানির হাটেও তুমুল হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, হাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে হট্টগোলের একপর্যায়ে একজন যুবলীগ নেতাকে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন সোহেল। এ ঘটনায় ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের এক নেতা আহত হন।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মাত্র ৪০ টাকা রিকশা ভাড়া নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটালেন সোহেল। ভাড়া না দিয়ে দিব্বি রাজার হালে চলে যাচ্ছিলেন। প্রতিবাদ করায় হতদরিদ্র রিকশাচালক কবির উদ্দীনের পায়ে গুলি করেন বলেন, ‘…..এই নে তোর ভাড়া’।

ক্যাডার বাহিনী : সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেল এক বিশাল ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তার ক্যাডার বাহিনীর শীর্ষে আছেন তারই আপন ভাতিজা জাকির ওরফে ভাতিজা জাকির ও ইমন ওরফে রাখাল ইমন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানী থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর যুগান্তরকে বলেন, সোহেলের ক্যাডার রাখাল ইমন আগে বনানীতে এক ব্যবসায়ীর গরু পালত। অর্থাৎ শহুরে রাখাল। একপর্যায়ে পরে গরু পালন ছেড়ে সোহেলের ক্যাডার বাহিনীতে যোগ দিলে সে ‘রাখাল ইমন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সোহেলের ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম সদস্যের নাম রবি ওরফে চাঁদা রবি। তিনি সোহেলের হয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন। তার ক্যাডার বাহিনীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সদস্য হলেন রাশেদ, ইব্রাহিম, সাত তলা বস্তির মাদক সম্রাজ্ঞী সুফিয়ার ছেলে শাহ আলম ওরফে মাদক সম্রাট শাহ আলম (রিকশাচালককে গুলি মামলার অন্যতম আসামি), জুয়েল, আজিম (২০১১ সালে ক্রসফায়ারে নিহত পাংকু’র ছোট ভাই)। এদের মধ্যে আজিমকে দিয়ে মহাখালী এলাকায় অবস্থিত জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেন সোহেল। এছাড়া মোস্তফা ওরফে হবির ছেলে মোস্তফাকে দিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা করানো হয়। তার ক্যাডারদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুমন, নয়ন, মান্নান ও রিপন। এরা মহাখালী দক্ষিণপাড়া এলাকায় বিভিন্ন মাদক ব্যবসা করে আসছে।

চাঁদাবাজি : নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে সোহেলের লোকজন। বিশেষ করে মহাখালী এলাকার জলখাবার হোটেলের পেছনে অবৈধ হকার্স মার্কেট থেকে মাসিক ৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া মহাখালী কাঁচাবাজারে সোহেলের লোকজন অবৈধভাবে ৫টি দোকানঘর তুলে মাসিক ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়ে রেখেছে। ভাড়া ছাড়াও দোকানপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে জামানত নেয়া হয়েছে। বনানী ২ নম্বর রোডের বিশাল জায়গা দখল করে আছে সোহেলের লোকজন। সেখানে পুরনো গাড়ি বেচাকেনার হাট বসানো হয়েছে। মহাখালী কাঁচাবাজারের ফলপট্টি, লেগুনা ও টেম্পোস্ট্যান্ড থেকেও দৈনিক মোটা অংকের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। মহাখালী কাঁচাবাজারে তিন তলায় অবৈধভাবে ১৩টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান থেকে আসে মোটা অংকের চাঁদা। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও নিপসমের (প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোস্যাল মেডিসিন) সব টেন্ডারও নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ মনোনীত কমিশনার আসলাম নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সোহেল। এছাড়া বনানী ও মহাখালী এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্ট, বাস টার্মিনাল এমনকি এ এলাকায় কেউ নতুন ভবন নির্মাণ করতে গেলেই সোহেলকে চাঁদা দিতে হয়।

সূত্র জানায়, মহাখালী বন ভবনের সামনে যুবলীগের অফিসটি সোহেলের সব অপকর্মের আস্তানা। এখানে বসেই তিনি সব অপকর্ম করেন। এই অফিসটি ঘিরে নানা অভিযোগ আসতে থাকলে গত এপ্রিলে সেখানে রেইড দেয় র‌্যাব। অভিযানের সময় সোহেল পালিয়ে গেলেও সেখান থেকে ৪শ’ পিস ইয়াবাসহ সোহেলের ৩ সহযোগীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

যুবলীগ নেতা সোহেলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বনানী থানা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক দুলাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, একটা ঘটনা ঘটেছে। এখন এ বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে দলীয় হাইকমান্ড তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তদন্ত পর্যায়ে কাউকে দোষী বলা ঠিক হবে না।

রিকশাচালককে গুলির ঘটনায় বনানী থানায় দায়েরকৃত মামলায় শনিবার মুচলেকা দিয়ে জামিন পান ইউসুফ সরদার ওরফে সোহেল। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রিপন কুমার যুগান্তরকে বলেন, তিনি জামিন পেলেও তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোহেলের লাইসেন্সকৃত একটি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর সেটি ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হবে।