টেকনাফ টুডে ডেস্ক : শিল্প পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল ইমরুল কায়েসের দুই চোখে ব্যান্ডেজ খোলার পর ঝাপসা দেখছেন। চোখ খুললেই ব্যথা। দুই পায়ের নিচের অংশ ঝলসে গেছে। ব্যান্ডেজ মোড়ানো।
ইমরুল কায়েস গত শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় মানুষজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই ঝলসে গেছেন। এখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। গতকাল সোমবার সকালে তাঁকে হাসপাতালের চক্ষু ওয়ার্ড থেকে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ওই কারখানার কর্মকর্তা অর্পণ করের বাঁ পা ও কোমর থেকে নিচের অংশের ঊরু পর্যন্ত ঝলসে যাওয়ার কারণে তিনি ছটফট করছেন। আগুনে পোড়া শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা। ছোট ফ্যান ব্যবহার করে শরীরের নিচের অংশে বাতাস দেওয়ার চেষ্টা করছে স্বজনরা। ভালো করে কথা বলতে পারছেন না অর্পণ।
শুধু এই দুজনই নন, আগুন ও বিস্ফোরণে দগ্ধ-আহত ৬৮ জন গতকাল বিকেল পর্যন্ত এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউতে দুজন, বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে ১৩ জন (দুজন আইসিইউতে), সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১০ জন, চট্টগ্রাম পুলিশ হাসপাতালে সাতজন এবং ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ১৬ জন চিকিৎসাধীন।
চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন দুজনের মধ্যে একজন লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশীদ। গতকাল বিকেলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্বাসনালী পোড়ায় জটিল অবস্থায় আছেন মাসুদ রানা নামের এক রোগী। তাঁর শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ’ পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রেজাউল করিম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে আমাদের এখানে নুরুল কাদের আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন। তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আরো ১২ জন চিকিৎসাধীন। ’
গতকাল দুপুরে চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনরা কেউ প্রিয়জনের সেবা করছেন, কেউ কাঁদছেন দগ্ধ প্রিয়জনের যন্ত্রণা দেখে। এই ইউনিটে সীতাকুণ্ডের ঘটনায় ১৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এই ইউনিটে শয্যা না থাকায় পাশের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশে অস্থায়ীভাবে ওয়ার্ড তৈরি করে আরো ৩১ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পোড়া। আবার কারো কারো শরীর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া রোগীও ভর্তি রয়েছেন। এ ছাড়া চক্ষু ওয়ার্ডে ১২ জন এবং অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে আটজন পোড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ভাঙা আহত রোগী রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চিকিৎসক জানান, আগুনে পোড়া রোগীদের অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। এ মুহূর্তে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের অধীনেই ৪৮ জন পোড়া রোগী ভর্তি আছেন। তাঁদের প্রায় অর্ধেকের আইসিইউতে রাখা গেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। এসব রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অভাব রয়েছে। রোগী বেশি থাকায় রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডের প্রবেশ মুখে ১৮ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন পুলিশ কনস্টেবল ইমরুল কায়েস একটু থেমে থেমে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আমরাও সেখানে গিয়েছি আগুনের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য। আমাদের সামনেই বিস্ফোরণ ঘটে। আমার দুই চোখে ঝাপসা দেখছি। শরীরের বিভিন্ন অংশে পোড়ার কারণে যন্ত্রণা করছে। খুব খারাপ লাগছে। ’
৩১ নম্বর ওয়ার্ডের (বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি অস্থায়ী ওয়ার্ড) ৩ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন অর্পণ করের বড় বোন ইলা কর বলেন, ‘আগুনে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়ার পর থেকে ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছে না। ছটফট করছে। ’
এদিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন গতকাল চমেক হাসপাতাল পরিচালকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দগ্ধ রোগীদের সংক্রমণ হলে কোনোভাবেই বাঁচানো যায় না। তাই রোগীদের কাছে অহেতুক ভিড় না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, চমেক হাসপাতালে যাঁরা দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেসব চিকিৎসকের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে এখানে কিছু সুযোগ-সুবিধার সংকট রয়েছে। সে জন্য মারাত্মক আহত রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ১৬ জন
‘রাতে ডিপোর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ করে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। মনে হলো বোমা ফাটছে। মুহূর্তের জন্য নীরবতা। কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন দেখতে পাই। বাতাস গরম হতে থাকে। ছোট্ট একটি আগুনের গোলা এসে পায়ের কাছাকাছি পড়ে। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যাই। এরপর একজন ধরে নিরাপদে নেয়। ’ গতকাল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আমিন সেখ (২২) তাঁর ভয়ংকর ওই অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। সীতাকুণ্ডের আগুনে তাঁর শরীরের ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁর মতোই এই ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আরো ১৫ জন। আরেকজন আছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
তাঁদের মধ্যে মো. সজিব (৩০) নামের একজনকে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতাল থেকে এই ইনস্টিটিউটে আনা হয়। সজিবের বন্ধু নয়ন হোসেন জানালেন, সজিবের বাড়ি ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানার পদ্মামনসা গ্রামে। বাবার নাম নুরুল ইসলাম। রাজধানীর আগারগাঁও তালতলা এলাকায় থাকেন তিনি। গত শুক্রবার টঙ্গী থেকে পোশাক কারখানার সামগ্রী নিয়ে সীতাকুণ্ডে যান তিনি। পরের দিন রাতে ডিপোতে আগুন লাগে। সেই আগুনেই দগ্ধ হন তিনি।
দগ্ধদের বিষয়ে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে একটি তালিকা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, এই ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া ১৬ জনের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের একজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী রবিন মিয়া (২২)। আগুনে তাঁর শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। এ ছাড়া মোফাখখারুল ইসলামের (৬৫) শরীরের ১২ শতাংশ, গাউসুল আজমের (২২) ৪০ শতাংশ ও ফরমানুল ইসলামের (৩২) ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
ইনস্টিটিউটের পরিচালক আবুল কালাম বলেন, ‘যাঁরা ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন, তাঁদের মধ্যে চারজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আছেন। তাঁদের একজনকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। বাকিদের মধ্যে অনেকের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। রোগীদের চিকিৎসায় ১০ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
এদিকে বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন আইয়ুব হোসেন গতকাল রাতে জানিয়েছেন, খালেদুর রহমান নামের এক রোগীর করোনা শনাক্ত হওয়ায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
গতকাল এই ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের দেখতে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বিএম ডিপোতে আগুনের ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া গতকাল এই ইনস্টিটিউটে দগ্ধদের দেখতে যান ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী।
সুত্র : কালের কণ্ঠ অনলাইন।
