Monday, January 17, 2022
Homeটেকনাফহ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে হত্যা ও ইয়াবা মামলার আসামীদের তৎপরতা

হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে হত্যা ও ইয়াবা মামলার আসামীদের তৎপরতা

সিবিএন:
পাক-হায়েনাদের বিরুদ্ধে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ অভ্যূত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে গণরায়ের বিস্ফোরণ, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ আমলে ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ’৯৬-এর ভোট ও ভাতের আন্দোলন, সুষ্ঠু গণরায় বাস্তবায়ন আন্দোলনহ অদ্যাবধি দেশ ও দশের কল্যাণে আন্দোলন সমূহের সফল নেতৃত্বদানকারী ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এখন সারাদেশে সুষ্ঠু ও সফলভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় দেশের প্রান্তসীমায় অবস্থিত ইয়াবা নগরী হিসেবে খ্যাত টেকনাফ উপজেলার ২১টি ইউনিটের মধ্যে উপজেলা ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ২০টি ইউনিটের নেতৃত্ব নির্বাচনে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসা, হত্যা, লুটপাত, অস্ত্রবাজ, নারী অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িতদের কঠোর হস্তে দমন করে নিয়মিত ছাত্রদের নিয়ে কমিটি গঠন করলেও হ্নীলা ইউনিয়ন ইউনিটে আগামী দিনের নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনের ঐতিহ্য ধরে কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ ৮ বছর পর আগামী ২৭ অক্টোবর হ্নীলা ইউনিয়ন শাখার সম্মেলন ও কাউন্সিল নির্ধারণ করে উপজেলা ছাত্রলীগ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সম্মেলন ও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করার পর থেকে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসার পাশাপাশি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সম্ভাব্য প্রার্থী যারা মাঠে নেমেছেন, তাদের মধ্যে সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে সাইফুল করিম, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ কায়েস, মোহাম্মদ আমিন, সাদ্দাম হোসেন করিম। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে নুরুল আমিন ফাহিম, সাদ্দাম হোসাইন, রহিম উল্লাহ, শাহ মোঃ ইমরান প্রমূখ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অপরাপর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা এককভাবে প্রচারণা চালালেও সাইফুল করিম ও নুরুল আমিন ফাহিম জোট বেঁধে প্রচারণা চালাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কাউন্সিলর জানান, প্রচারণা চলাকালে সাইফুল-ফাহিম জোট এই বলে কাউন্সিলরদের প্রভাবিত করছে যে, ‘উপজেলা থেকে আমরা দুইজন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সিলেক্টেড হয়ে গেছি। ফর্মালিটি মেন্টেইনের জন্য লোক দেখানো এই সম্মেলন ডাকা হয়েছে। প্রথম অধিবেশন হবে হ্নীলায় আর দ্বিতীয় অধিবেশন উপজেলায় গিয়ে আমাদের নাম ঘোষণা করা হবে।’ একইভাবে অপর এক কাউন্সিলর সাইফুল-ফাহিম জোটের উদ্বৃতি দিয়ে জানান, ‘যারা কমিটি নির্বাচন করবে, তাঁদেরকে মোটা অংকের টাকা ও উপহার দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে।’
saiful-karim-mamla
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সভাপতি পদপ্রার্থী সাইফুল করিম একজন একাধিক অস্ত্র, ছিনতাই, হত্যাচেষ্টা, ছাত্রী অপহরণ ও ইয়াবা মামলার আসামী। ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারী সদর থানার লিংক রোডস্থ তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়ার নেতৃত্বে একদল গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাইফুল করিমের পরনের প্যান্টের পকেট থেকে ৭ শত পিস ইয়াবাসহ তাকে আটক করে। ঐদিনই তাকে ইয়াবাসহ কক্সবাজার সদর থানায় সোপর্দ করে ১০ নং মামলা রুজু করে আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট তাকে কারাগারে প্রেরণ করে। দীর্ঘ সাত মাস কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে এসে পূণরায় পুরোদমে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের ২২ এপ্রিল আবুল হোছাইন মেম্বার বাদী হয়ে তার ছোট ভাই হামিদ হোছাইনকে হত্যাচেষ্টা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে সাইফুল করিমকে প্রধান আসামী করে টেকনাফ থানায় মামলা রুজু করেন। যা ওসি ফরহাদ হোসেন ৫৩ নাম্বারে নথিভুক্ত করেন। ২০১৩ সালের ১৬ আগষ্ট দিবাগত রাত দেড়টার দিকে হ্নীলা পূর্ব সিকদার পাড়াস্থ ঘরের দরজা ভেঙ্গে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হ্নীলা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোক্তার আহমদের কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে মেয়ের বাবা থানায় গিয়ে সাইফুল করিমসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের করে। ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী স্থানীয় নাটমোরা পাড়া গ্রামের মৃত আবদুল জলিল চৌধুরীর পুত্র মোহাম্মদ কলিম বাদি হয়ে সাইফুল করিমসহ ১০ জনকে আসামী করে টেকনাফ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করে। যা ওসি মাহবুবুল হক ৫৬ নাম্বারে নথিভুক্ত করেন। অপরদিকে সাইফুল করিম ইয়াবা ব্যবসা করে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হন। ইতিমধ্যে তিনি কয়েকটি বিলালবহুল গাড়ীসহ অঢেল সম্পদের মালিক হন। সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর দরগাহ ষ্টেশনে সাইফুল করিমের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া চালিয়ে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টির করে। বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় এবং অনলাইন মিডিয়ায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সোস্যাল মিডিয়ায় তাঁর নেতৃত্বে অস্ত্র মহড়ার ভিডিও প্রকাশ পেলে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।
nurul-amin-fahim-bsl-nihla-1
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী নুরুল আমিন ফাহিম একজন হত্যা মামলার প্রধান আসামী, সরকারী কর্তব্য কাজে আক্রমণকারী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী। ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারস্থ টেকনাফ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের আমলী আদালতে টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ কবির হোসেনের দাখিলকৃত ৫৮৬ নাম্বার চার্জশীট সূত্রমতে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারী সন্ধ্যা ৬টায় র‌্যাব-৭ (কক্সবাজার)-এর ডিএডি মোহাম্মদ আলী হায়দারের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল নুরুল আমিন ফাহিমের বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ তার মা মিনারা বেগমকে আটক করে নিয়ে যায়। এরই সূত্র ধরে ফাহিমের নেতৃত্বে দূধর্ষ একদল ইয়াবা ব্যবসায়ী র‌্যাবের সোর্স সন্দেহে তার বাড়ীর পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা হ্নীলা হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী সরোয়ারুল ইসলামকে অপহরণ করে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে নিয়ে পৈচাশিক কায়দায় নির্মমভাবে নির্যাতন করে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। পরে সরোয়ারের পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে সে দীর্ঘ ৫ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ১৭ জানুয়ারী বিকাল ৪টায় মারা যায়। ২০১৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী নিহত সরোয়ার মা ছকিনা বেগম বাদী হয়ে নুরুল আমিন ফাহিমকে প্রধান আসামী করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ৩৬৪/৩০২/৩৪ ধারায় কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেটের ৩নং আমলী আদলতে সিআর মামলা দায়ের করে। যা উক্ত আদালতে ৪০/১৪ নং নথিভূক্ত হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) দিদারুল ফেরদৌস তদন্ত করেন। তিনি বদলী হলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ওসি (তদন্ত) মোঃ কবির হোসেন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আদালতে চুড়ান্ত চার্জশীট দাখিল করেন। তিনি নুরুল আমিন ফাহিমকে ইয়াবা ব্যবসায়ী উল্লেখ করে প্রধান আসামী হিসেবে সরোয়ার হত্যার সম্পৃক্ততা পান বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া আদালতে দাখিলকৃত চার্জশীটে অপরাপর আসামীরা জামিন নিলেও ফাহিম জামিন নেয়নি বলে উল্লেখ করে তাকে পলাতক আসামী হিসেবে দেখানো হয়।
২০০৯ সালের ২৮ আগষ্ট ৪২ বিজিবি’র নয়াপাড়া বিওপি’র নায়েব সুবেদার সরোয়ারর্দী বাদী হয়ে চোরাই গরু উদ্ধারকালীন সময়ে সরকারী কর্মচারীদের উপর আক্রমণ ও কর্তব্য কাজে বাঁধা প্রদানের অভিযোগে নুরুল আমিন ফাহিমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যা থানায় ১৭ নাম্বারে নথিভুক্ত হয়।
উল্লেখ্য যে, ফাহিমসহ তার পুরো পরিবার ইয়াবা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তার পিতা-চাচাসহ বেশ কয়েক জনের নাম আছে। ২০১৪ সালের ২০ মার্চ ইয়াবার চালান খালাসের সময় বিজিবি-র‌্যাবের সাথে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বন্দুকযুদ্ধে ফহিমের পিতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ নিহত হন। তার পিতা নিহত হলে বড় পুত্র হিসেবে পৈত্রিক ব্যবসার হাল ধরেন। ব্যবসার সুবিধার্থে চট্টগ্রাম প্রবর্তক স্কুল এন্ড কলেজে লেখাপড়ার নাম দিয়ে চট্টগ্রামের শীতল ঝর্ণা এলাকায় অবস্থান করে পুরোদমে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর গোপন সূত্রে খবর পেয়ে চট্টগ্রাম বায়েজিদ থানা পুলিশ তার বাসায় অভিযান চালায়। এসময় ফাহিম কৌশলে পালিয়ে গেলে অভিযানে তার বাসা থেকে ৩৬ হাজার পিস ইয়াবা ও ইয়াবা লেনদেনের নগদ ৪৮ লাখ টাকা নিয়ে ছোট বোন সেলিনা আক্তার সেলিসহ ৪ জনকে আটক করে। তার দুই চাচা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত ইয়াবা গড ফাদার নুরুল হুদা ও নুরুল কবিরের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুই ডজনেরও বেশী মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তার চাচা নুরুল হুদা গত ইউপি নির্বাচনে কালো টাকা ছড়িয়ে মেম্বার নির্বাচিত হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকের ভয়ে এখনো শপথ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি।

স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে, হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যদি এই দুই জন চিহ্নিত একাধিক অস্ত্র, হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ছিনতাই, ছাত্রী অপহরণ, সরকারী কর্তব্য কাজে আক্রমণকারী ও ইয়াবা মামলার আসামীরা আসীন হন, তাহলে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠন তার হৃত গৌরব হারিয়ে ফেলবে। সংগঠনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আসন্ন হ্নীলা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ কাউন্সিলে চিহ্নিত অপরাধীদের স্থান না দিয়ে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্রলীগের সুযোগ্য জেলা সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয়, সাধারণ সম্পাদক ইমরুল হাসান রাসেদ চেয়ারম্যান, উপজেলা সভাপতি মোহাম্মদ সোলতান ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুন্নাসহ সংগঠনের নীতি-নির্ধারকদের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেন রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments