টেকনাফ টুডে ডেস্ক :বাংলাদেশে বর্তমানে তিন ধরনের স্থানীয় সরকার বিদ্যমান। ১. নগরীয় স্থানীয় সরকার, যেমন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। ২. গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, যেমন ইউনিয়ন পরিষদ। ৩. গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় সরকার, যেমন জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ। এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ হলো গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার তৃণমূল ইউনিট। আমাদের দেশে এখনো এই গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ইউনিট; ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্ব অপরিসীম।
গ্রামের সহজ-সরল মানুষ আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে প্রথমে ছুটে যান ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কাছে। ছোটখাটো ঝগড়া-বিবাদ, পারিবারিক কলহ স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ যুগ যুগ ধরে অসামান্য অবদান রেখে আসছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ইউনিয়ন পরিষদে আব্দুল মতিন সরকার নামের একজন স্বল্পশিক্ষিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তার কাছে ধনী-দরিদ্রের কোনো পার্থক্য ছিল না। তার চালচলন ও কথাবার্তা এবং পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল অতি সাধারণ। তার জামার পকেটে থাকত সিল ও প্যাড। কেউ কোনো কাজে এলে বিলম্ব না করে মতামত লিখে পকেট থেকে সিল-প্যাড বের করে স্বাক্ষর ও সিল মেরে দিতেন। মানুষ খুব খুশি হতো তার কাজে। তার নিঃস্বার্থ জনসেবা, অমায়িক ব্যবহারের জন্য তিনি একনাগাড়ে ২০ বছর চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
এরশাদ আমলে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল জলিল প্রধান। তিনি তার ইউনিয়ন পরিষদের সব রাস্তার দু’ধারে পরিকল্পিতভাবে নারিকেল গাছ রোপণ করেছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল নারিকেলের শাঁস থেকে তেল, মালাই থেকে মশার কয়েল তৈরি করা। ছোবড়া থেকে হবে ম্যাট্রেস এবং পাতা ও পাতার কাঠি দিয়ে হবে ঝুড়ি ও ঝাড়ুর মতো কুটির শিল্পজাত দ্রব্য। বহু দরিদ্র লোক কাজ করবে। তাদের কর্মসংস্থান হবে। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যও সুরক্ষিত হবে। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, ততদিন গাছগুলো বেঁচে ছিল। বৃক্ষপ্রেমিক আব্দুল জলিল প্রধানের মৃত্যুর পর অযতে্ন অবহেলায় প্রায় অর্ধেকের বেশি গাছ মারা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদে যে শুধু ভালো পরোপকারী কাউন্সিলর ও চেয়ারম্যান আছেন তা নয়, কিছু কাউন্সিলর চেয়ারম্যান আছেন, যারা জনপ্রতিনিধি নামের কলঙ্ক। তাদের কেউ কেউ সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করেন। থানার দালালি করেন। নারী নির্যাতন করেন। ভুয়া নামে বয়স্কভাতা তুলে অসহায় প্রবীণদের বঞ্চিত করেন। নিজের স্ত্রীর নামে বিধবাভাতা তুলেন। ভিজিডি, ভিডিএফের চাল আত্মসাৎ করেন। কোনো কোনো সীমান্ত এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার মতো ঘৃণিত কাজে সংশ্লিষ্ট থাকার খবরও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
ভোটের মাধ্যমে স্থানীয় ইউনিটের জনগণ তাদের যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। ভোট প্রদানকালে স্থানীয় জনগণ প্রার্থীদের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, সততা, নিষ্ঠা, পরোপকারিতা আচার-ব্যহার, পারিবারিক ইতিহাস, প্রার্থীর অতীত ইতিহাস, কর্মকা-, চলাফেরা, কথা বলার ভঙ্গিসহ নানা বিষয় বিবেচনা করেন। সুষ্ঠ নির্বাচন হলো কাজের কষ্টিপাথরে প্রার্থীদের স্বর্ণপরীক্ষা। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচনের সেই চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে পেশিশক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ অর্থের কাছে। কেউ কেউ নির্বাচনী নীতিমালা ভঙ্গ করে ভোটের আগের রাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ভোট ক্রয় করেন। শাড়ি, লুঙ্গি, বিড়ি, সিগারেট এবং মেয়েদের পান, জর্দার কৌটা দিয়ে প্রলুব্ধ করেন। এ ধরনের নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটে না। নির্বাচনের নামে হয় টাকার খেলা।
এমন পরিস্থিতিতেই আগামী ১১ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপে ৯টি পৌরসভায় এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপে ৩২৩টি ইউনিয়নে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনগুলো পৌরবাসী ও সচেতন মানুষের প্রত্যাশা পূরণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি গণতন্ত্রের জন্য জীবনের সোনালি দিনগুলো জেলখানায় কাটিয়েছেন, নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এসব লোক দেখানো নির্বাচন জাতির জনকের নীতি-আদর্শের প্রতি অবমাননা। তাই আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে যে চরম হতাশা বিরাজ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে কয়েক ধাপে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০টি জেলার ৬৩টি উপজেলার ৩২৩টি ইউপির ভোট হবে ১১ এপ্রিল। এবারও দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ৪১টি ইউপিতে ইভিএমে ভোট হবে। বর্তমানে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা হলো ৪ হাজার ৪৮৩টি। পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালের ২২ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ছয় ধাপে দলীয় প্রতীকে ভোট হয়েছে ৪ হাজার ৩২১টিতে এবং অন্যান্য সময়ে ভোট হয়েছে ১৬২টিতে।
২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ২৯ ধারায় পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কার্যকাল বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রথম সভা অনুষ্ঠানের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ থাকবে পরিষদের। পরিষদ গঠনের জন্য কোনো সাধারণ নির্বাচন ওই পরিষদের জন্য অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। দৈব-দুর্বিপাকজনিত বা অন্য কোনো কারণে নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে সরকার লিখিত আদেশ দ্বারা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কিংবা অনধিক ৯০ দিন পর্যন্ত যা আগে ঘটবে, সংশ্লিষ্ট পরিষদকে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্ষমতা দিতে পারে।
আমরা বহুকাল থেকে দেখে আসছি অনেক অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সমাজের সেবা করেন। দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের আইন প্রণয়নের কারণে অরাজনৈতিক সমাজসেবক ব্যক্তিরা এখন আর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারছেন না। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হচ্ছেন বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা। এতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে মারামারি হানাহানি সৃষ্টি হচ্ছে। উপদলীয় কোন্দল হচ্ছে। বিদ্রোহী প্রার্থী ও মদদদাতাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এব কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
নেতা তৃণমূল থেকেই তৈরি হয়। ইউনিয়ন পরিষদ হলো নতুন সবুজ পাতার মতো নতুন নেতা তৈরির কারখানা। এখান থেকে নেতা তৈরি হয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। জাতীয় সংসদের সদস্য হন। মন্ত্রী হন। এসবের যথেষ্ট প্রমাণ আছে ভারতীয় উপমহাদেশে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বরিশাল পৌরসভার নির্বাচিত কমিশনার ছিলেন, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে এমপি। এমপি থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক সরকার এক সময় বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান, সেখান থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জনগণের অপরিসীম ভালোবাসার কারণে। কোনো কারখানায় যদি যান্ত্রিক ত্রুটি থাকে, সেই কারখানা থেকে গুণগত মানের পণ্য পাওয়ার প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র। আমাদের নেতা তৈরির কারখানাটি জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে স্থানীয় সরকাররূপী এই আড়াই শত বছরের পুরনো কারখানাটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নয়, ইউনিয়ন বিধানিক বিভাগ (সংসদ) ইউনিয়ন নির্বাহী বিভাগ ও ইউনিয়ন বিচারিক বিভাগ এই তিনের সমন্বয়ে সারা দেশে একরূপ ইউনিয়ন সরকার গঠন করা যেতে পারে। প্রতি ওয়ার্ড থেকে একজন পুরুষ ও একজন নারী কাউন্সিলর জনসাধারণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। এই নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে ইউনিয়ন সংসদ গঠিত হবে। নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তার কাজ হবে অনেকটা জাতীয় সংসদের স্পিকারের মতো। সংসদের মেয়াদ থাকবে পাঁচ বছর। ইউনিয়ন সংসদ হবে ইউনিয়নের সব কর্মকান্ডের গণতান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রবিন্দু। ইউনিয়ন সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো ইউনিয়ন নির্বাহী বিভাগ বাস্তবায়ন করবে। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত চেয়ারমান নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন। ইউনিয়ন সংসদে বার্ষিক বাজেট উত্থাপিত ও অনুমোদিত হবে।
ইউনিয়ন পরিষদের বাধ্যতামূলক কাজ ১০টি এবং ঐচ্ছিক কাজ ৩৮টি। কিন্তু এসব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। আবার যে লোকবল আছে তারাও নিয়মিত ইউইনিয়ন পরিষদ থেকে বেতনভাতা পান না। বেতনের জন্য উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে সরকারের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। এজন্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। স্বনির্ভর হতে হবে। জাতীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে নয়, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে।
স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশ দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি করতে পারেনি। তাই আর বিলম্ব না করে গতানুগতিক ইউনিয়ন পরিষদের কাঠামোগত সংস্কার সাধন করে ইউনিয়ন সরকার গঠন করাটাই হবে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@yahoo.com
