সাইবার দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘কভিড-১৯ বিশে্ব সমতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ অর্জনের জন্য নারী নেতৃত্ব’। বিশ্বব্যাপী যেদিন নারী দিবস পালিত হচ্ছে সেদিনই দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ‘সাইবার অপরাধীদের সহজ শিকার নারী’।

নারী কোথাও নিরাপদ নয়। বাস্তবের ঘর-গৃহস্থালির দুনিয়া আর ডিজিটাল বা সাইবার দুনিয়া, সবখানেই নারী হামলার সহজ লক্ষ্য। তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও আরামদায়ক করে দিয়েছে বটে। কিন্তু সুফলের বিপরীতে এর অন্ধকার রূপটিও কম ভয়ানক নয়। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে হয়রানিকে সাইবার বুলিং বলে অভিহিত করা হচ্ছে। এটি নারীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। সাইবার হামলার শিকার হয়ে ব্যক্তিজীবন তছনছ হওয়া থেকে শুরু করে আত্মহননের ঘটনাও ঘটে চলেছে। সাইবার অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করলে, ছবি বা ভিডিও আপলোড করলে, কারও নামে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট দিলে, কোনো স্ট্যাটাস দিলে কিংবা শেয়ার বা লাইক দিলেও সাইবার অপরাধ হতে পারে। এই অপরাধে সাজার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদন্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদন্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।

দেশে সাইবার অপরাধ সচেতনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন’ এর এক জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধের শিকার অর্ধেকের বেশি ব্যক্তিই আইনের সহায়তা নেন না। ৩০ শতাংশ ব্যক্তি এই অপরাধের বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সে বিষয়েই জানেন না। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না মনে করে অভিযোগ দায়ের করেন না ২৫ শতাংশ ব্যক্তি। সাইবার অপরাধের শিকার নারী-পুরুষ উভয়ই হন। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশই নারী। যখন সাইবার বুলিং বা এমন অপরাধের শিকার কোনো নারী, তখন তারা সহজে থানায় যেতে চান না। ডিজিটাল দুনিয়াতেও সহজেই হামলার লক্ষ্যতে পরিণত হন নারীরা। সমাজে নারীর অবস্থান ও লোকলজ্জার ভয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী তার অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হন না।

তবে আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে চালু হয়েছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’। এর উদ্দেশ্য নারীদের জন্য নিরাপদ সাইবার জগৎ তৈরি করা। তথ্যমতে, সেখানে মাত্র দেড় মাসে (৪ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত) ৭ হাজার ২৪৯ জন অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এখন জেলা পর্যায় থেকেই সাইবার অপরাধ মনিটরিং করবে পুলিশ। এ জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশেষ দল গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া সাইবার অপরাধ দমনে ‘সাইবার পুলিশ সেন্টার’ গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। তবে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করতে গেলে প্রযুক্তি দক্ষ মানুষের পাশাপাশি মনোরোগ চিকিৎসক, মনোবিদ ও আইনজীবীদের সংযুক্ত রাখতে হবে। সাইবার মাধ্যমে হামলার ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় একেক জনের ভোগান্তির মাত্রা একেক রকম। কারও গোপন ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, কারও ক্ষেত্রে মিথ্যা অপপ্রচার, আবার কারও ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন আইডি হ্যাক করে টাকা দাবি। আবার কখনো ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়।

নারীর জন্য নিরাপদ সাইবার দুনিয়া নিশ্চিতে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টা ও শাস্তির বিধান নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মনোচিকিৎসক বা কাউন্সেলিং রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। নারীর অগ্রযাত্রাকে আরও নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে সাইবার বা ডিজিটাল প্লাটফর্ম নারীর জন্য সমান নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত করা জরুরি। নারীর জন্য নিরাপদ সাইবার দুনিয়া নিশ্চিত করা গেলে তা সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়ক হবে। এ জন্য দরকার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোগান্তির শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি সহায়তা গ্রহণ করা ও সর্বোপরি পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব আরোপ করা।