মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা : শাফাআত শব্দের অর্থ সুপারিশ। কারো জন্য সুপারিশ করাকে শাফাআত বলে, হোক সেটা কারো উপকার লাভের জন্য কিংবা কাউকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য। প্রতিটি মুসলমানই শাফাআত শব্দটির সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত। সবাই নবীজি (সা.)-এর শাফাআতের আকাঙ্ক্ষা করে।
আজকে আমরা আলোচনা করব শাফাআতের বিভিন্ন স্তর ও প্রকারভেদ নিয়ে। এতে শাফাআত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরো স্বচ্ছ হবে ইনশাআল্লাহ। শাফাআত প্রথমত দুই প্রকার।
১. কিছু শাফাআত আখিরাত ও কিয়ামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২. কিছু শাফাআত দুনিয়ার বিষয়াদির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে শাফাআত আখিরাত ও কিয়ামতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা আবার দুই প্রকার।
১. ‘শাফাআতে খাছছাহ’ বা বিশেষ শাফাআত। ২. ‘শাফাআতে আম্মাহ’ বা সাধারণত শাফাআত। নিম্নে ‘শাফাআতে খাছছাহ’-এর শাখা-প্রশাখাগুলো আলাদা আলাদা তুলে ধরা হলো:
বিশেষ শাফাআত
‘শাফাআতে খাছছাহ’ বা বিশেষ শাফাআত হলো, যা শুধু নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ছাড়া অন্য কাউকে যার অধিকার দেওয়া হবে না। নিম্নে ‘শাফাআতে খাছছাহ’র কয়েকটি স্তর তুলে ধরা হলো;
বড় শাফাআত : এটি মূলত মাকামে মাহমুদের শাফাআত, যার প্রতিশ্রুতি মহানবী (সা.)-কে দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো তোমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত অবস্থানে (মাকামে মাহমুদে) প্রতিষ্ঠিত করবেন। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
আলোচ্য আয়াতে মহানবী (সা.)-কে মাকামে মাহমুদের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে। মাকামে মাহমুদ শব্দদ্বয়ের অর্থ, প্রশংসনীয় স্থান। এই মাকাম মহানবী (সা.)-এর জন্যই বিশেষভাবে নির্দিষ্ট।
মহানবী (সা.) নিজেই এই জায়গাকে ‘বড় শাফাআতের মাকাম’ আখ্যা দিয়েছেন। হাশরের মাঠে যখন সমগ্র মানবজাতি একত্র হবে এবং প্রত্যেক নবীর কাছেই শাফাআতের আবেদন করবে, তখন সব নবীই শাফাআত করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন। তখন শুধু মুহাম্মদ (সা.)-ই সমগ্র মানবজাতির জন্য শাফাআত করবেন। এ সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, কিয়ামতের দিন লোকেরা দলে দলে বিভক্ত হবে। প্রত্যেক উম্মত তার নিজের নবীর কাছে যাবে। তারা বলবে, হে অমুক (নবী), আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফাআত করুন। হে অমুক (নবী), আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফাআত করুন। (কিন্তু তারা কেউ শাফাআত করতে রাজি হবেন না)। শেষ পর্যন্ত শাফাআতের দায়িত্ব এসে পড়বে মহানবী (সা.)-এর ওপর। আর এই দিনেই আল্লাহ তাকে মাকামে মাহমুদে দাঁড় করবেন। (বুখারি, হাদিস : ৪৭১৮)
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আজান শোনার পর এ দোয়া পড়বে, ‘হে আল্লাহ, এ পরিপূর্ণ আহ্বানের এবং প্রতিষ্ঠিত নামাজের রব, মুহাম্মদ (সা.)-কে উসিলা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করুন, প্রতিষ্ঠিত করো তাঁকে মাকামে মাহমুদে, যার ওয়াদা তুমি করেছ। ’ কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যাবে। (বুখারি, হাদিস : ৪৭১৯)
জান্নাতের দরজা খোলার শাফাআত: কিয়ামতের দিন মহানবী (সা.)-এর শাফাআত ছাড়া জান্নাতের দরজাও খোলা হবে না। মহানবী (সা.)-এর শাফাআতের পরই জান্নাতের দরজা খোলা হবে এবং যারা জান্নাতের উপযুক্ত হবে, তারা সেখানে প্রবেশ করতে পারবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামত দিবসে আমি জান্নাতের তোরণে এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইব। তখন দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তর করব, মুহাম্মদ। দ্বাররক্ষী বলবেন, ‘আপনার জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি, আপনার আগে অন্য কারো জন্য দরজা খুলিনি। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৭৪)
কিছু লোককে বিনা হিসেবে জান্নাত দেওয়ার শাফাআত :
মাবাদ ইবনে হিলাল আনাজি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বসরাবাসী কিছু লোক একত্র হয়ে আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর কাছে গেলাম। আমাদের সঙ্গে সাবিত (রা.)-কে নিলাম, যাতে তিনি আমাদের কাছে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত শাফাআত সম্পর্কিত হাদিস জিজ্ঞেস করেন। আমরা তাঁকে তাঁর মহলেই চাশতের সালাতরত পেলাম। তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাদের অনুমতি দিলেন। তখন তিনি তাঁর বিছানায় উপবিষ্ট অবস্থায় আছেন। অতঃপর আমরা সাবিত (রা.)-কে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন শাফাআতের হাদিসটি জিজ্ঞেস করার আগে অন্য কিছু জিজ্ঞেস না করেন। তখন সাবিত (রা.) বলেন, হে আবু হামজাহ, এরা বসরাবাসী আপনার ভাই, তারা শাফাআতের হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছে। অতঃপর আনাস (রা.) বলেন, আমাদের কাছে মুহাম্মদ (সা.) হাদিস বর্ণনা করেছেন যে… আমি তখন আমার রবের কাছে অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমাকে প্রশংসাসূচক বাক্য ইলহাম করা হবে, যা দিয়ে আমি আল্লাহর প্রশংসা করব, যেগুলো এখন আমার জানা নেই। আমি সেসব প্রশংসাবাক্য দিয়ে প্রশংসা করব এবং সাজদায় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, ইয়া মুহাম্মদ, মাথা ওঠাও। তুমি বলো, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেওয়া হবে। সুপারিশ করো, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক, আমার উম্মত, আমার উম্মত; বলা হবে, যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদের জাহান্নাম থেকে বের করে দাও। আমি গিয়ে এমনই করব। …(বুখারি, হাদিস : ৭৫১০)
