মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে আরও সতর্কতা দরকার

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাঙালি জাতি বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। গৌরবোজ্জ¦ল সে ইতিহাসেরও অর্ধশতাব্দী পেরুচ্ছে। বাংলাদেশ এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান অঙ্গীকার। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ জাতীয় নেতাদের বেশিরভাগই স্বাধীন দেশে মারাত্মক রাজনৈতিক হত্যাকা-ের শিকার হন। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুরু হয়েছিল তা কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্য আদর্শ থেকেই বিচ্যুত করেনি, ক্রমান্বয়ে তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধকেই রাজনীতিকরণের হাতিয়ার করে তোলে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিজয় এসেছে ঠিকই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হীন রাজনীতির অবসান হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটেই দেশে বহু বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বাগ্বিত-া আর যাচাই-বাছাই চলছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দফায় দফায় তালিকা আর নানা মানদ- পাল্টানো হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বারবারই বিতর্কিত হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকার বিষয়টি মীমাংসা না হওয়া অনাকাক্সিক্ষত।

সরকার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে চায়। ইতিমধ্যে থানা পর্যায় থেকে চূড়ান্ত তালিকাও তৈরি হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর খসড়া তালিকা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। সে তালিকায় বাদ পড়ায় সনদপ্রাপ্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধা পুনরায় তালিকাভুক্ত হতে আবেদনও করেছেন। কিন্তু চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়েও বাদ পড়েছেন অনেকে। এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন, ‘মুক্তিবার্তায়’ নাম আছে, নিয়মিত ভাতাও পেতেন, কিন্তু হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল ভাতা, ব্যাংকে আর টাকা যায় না। তালিকা থেকে বাদ পড়া কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতি এবং মিথ্যা তথ্য গ্রহণের কারণে অনেকের নাম বাদ পড়েছে। ঢাকা জেলার একটি থানার এক মুক্তিযোদ্ধা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ে অনেক জায়গায় থানার দায়িত্বপ্রাপ্তরা অনিয়ম করেছেন।’ এ পরিস্থিতিতে বাদ পড়া অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাও যদি তালিকা থেকে বাদ পড়েন তাহলে সেটি ন্যায়সংগত হবে না।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ১৯৮৪ সালে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের সময়। তখন থেকে দেশে এ পর্যন্ত ৬ বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে। আর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে অনেকবার। তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়সের সীমাও কয়েকবার নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত বয়স হচ্ছে ১৯৭১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধার বয়স ন্যূনতম সাড়ে ১১ বছর হতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে এখন যে বিতর্ক চলছে সে বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছে, ২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বা ‘জামুকা’ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিপুল পরিমাণে গেজেট প্রকাশ করা হয়, যাদের সমর্থনে অন্য কোনো প্রমাণক (লাল মুক্তির্বাতা, ভারতীয় তালিকাসহ ৩৩ ধরনের প্রমাণক) নেই। অবশ্য এখানে উল্লেখ্য, জামুকা আইনটি ২০০২ সালে হলেও ২০১০ সালের আগে জামুকা প্রতিষ্ঠিতই হয়নি। এদিকে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, এখন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, আগে মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভিন্ন ভিন্ন তালিকা ছিল, অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক তালিকা, ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রণীত মুক্তিবার্তায় অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা সবার নাম এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে, গবেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ওই সময়টাতে (২০০২-২০০৯) বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় লিখিয়েছে। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই এখন মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের হর্তাকর্তা। ফলে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আবার নাম বাদ পড়া ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে ৩৩টি প্রমাণের শর্ত দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর অনেকের পক্ষেই সেসব জোগাড় করা সম্ভব নয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ আর বারবার নানা ভুলভ্রান্তি নিয়ে যেমন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ তেমনি দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় নিয়োজিত বুদ্ধিজীবীরা নানা সময়ে বলে আসছেন যে সব মুক্তিযোদ্ধার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের কাজটিও তাত্ত্বিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। কেননা, একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন নিয়মিত সামরিক, আধাসামরিক ও প্রশিক্ষিত মুক্তিবাহিনী ও গেরিলারা অংশ নিয়েছেন, তেমনি সারা দেশের অগণিত নারী-পুরুষ নানাভাবে এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবেই অংশগ্রহণ করেছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চরিত্রগত দিক থেকেই ছিল একটা সর্বাত্মক গণযুদ্ধ। তারা বলছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে একেবারেই নির্ভুল একটি তালিকা করা কঠিন। তাই এ তালিকা শতভাগ পূর্ণাঙ্গ বা এটাই শেষ তালিকা এমনটা বলা যাবে না।