টেকনাফ টুডে ডেস্ক : ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কর্তৃক কংগ্রেসে ক্রেতা-ভোক্তা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণে প্রতি বছরের ১৫ মার্চ বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশও এই দিবসটি পালন করে থাকে। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের প্রবক্তা মার্কিন সিনেটর ও মাল্টিন্যাশনাল মনিটর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা রাল্ফ নাদের। সারা বিশ্বের ভোক্তা সংগঠনগুলোর ফেডারেশন Consumer International (CI) ভোক্তা অধিকার প্রচারণার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর বা দাবি আদায়ের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক। সারা বিশ্বের ১১৫টি দেশের ২২০টিরও বেশি সংগঠন এর সদস্য। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), কনজুমারস ইন্টারন্যাশনাল-এর পূর্ণাঙ্গ সদস্য।
এবার ‘বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস’-এর বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য বিষয় ‘প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ’। আর বাংলাদেশি সংস্করণে এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে ‘মুজিববর্ষে শপথ করি, প্লাস্টিক দূষণ রোধ করি’। প্লাস্টিক দূষণের কারণে পরিবেশ ও জলবায়ুর কী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এবং তা ভোক্তাদের জীবন ও জীবিকায় কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সে বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টিতেই এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্লাস্টিক, আমাদের কাছে অতি পরিচিত একটি শব্দ। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের জীবনে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার প্রায় সর্বব্যাপী। সকালে উঠে যে ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজছি এবং যে টিউব থেকে টুথপেস্ট আসছে, সেসবও প্লাস্টিকের তৈরি। নিত্যদিনের খাবার-দাবার এবং জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবে প্লাস্টিক পণ্য এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক যেহেতু পচনশীল নয়, তাই ব্যবহারের পর যেসব প্লাস্টিক পণ্য ফেলে দেওয়া হয়, তার অধিকাংশই যুগের পর যুগ একইভাবে পরিবেশে টিকে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক গবেষণায় বলেছে মুদি দোকান থেকে কেনা পণ্য বহন করার জন্য যেসব পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস কিংবা কোমল পানীয়ের জন্য যেসব প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। আর ডায়াপার এবং প্লাস্টিক বোতল ৪৫০ বছর পর্যন্ত পচে না।
আমরা অনেকেই প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা জেনেও প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক দ্রব্য ব্যবহার করছি। ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য নানাভাবে মিশে যাচ্ছে পরিবেশের সঙ্গে। যার ফলস্বরূপ উর্বর মাটি হচ্ছে অনুর্বর, জলাশয় জলজ প্রাণীর জন্য হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। প্লাস্টিক দূষণ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান একটি সমস্যা। বাংলাদেশ বছরে ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সৃষ্টি করে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য সৃষ্টি হয় যা বছরে সৃষ্ট মোট বর্জ্যরে ৮ শতাংশ। প্রায় ৭৩,০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিদিন বঙ্গোপসাগরে মিশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর মাধ্যমে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯)। ফলে এটা ধারণা করাই যায়, প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা কতখানি জরুরি। অবশ্য সুবিধার অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অপর্যাপ্ত বাজেট ইত্যাদি নানা সমস্যার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। প্লাস্টিক দূষণের পরিবেশগত বিপর্যয় উত্তরণের জন্য একটি টেকসই উপায় হচ্ছে ব্যবহার কমানো এবং পুনর্ব্যবহার ও পুনঃচক্রায়ন বাড়ানো। কিন্তু এদেশে প্লাস্টিকের বোতল ও বিভিন্ন সামগ্রী এবং পলিথিন ব্যাগের অধিকাংশই পুনর্ব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন না করে প্রাকৃতিক পরিবেশে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। যা পরে খাল, নদী, সমুদ্রে জমা হচ্ছে। সেখান থেকে জলজ প্রাণীরা খাদ্যের সঙ্গে এসব ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক গ্রহণ করছে। এসব প্রাণীর মাধ্যমে প্লাস্টিক আবার খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।
জনজীবন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরকার আইন করে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু আইনটি প্রয়োগে শিথিলতার কারণে বর্তমানে সারা দেশে পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে ১৫ হাজার মেট্রিক টন প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ২০ বছরে ব্যবহার বেড়েছে ৫০ গুণ। বর্তমানে দেশে ছোট, মাঝারি, বড় ৫ হাজার শিল্পকারখানায় ১২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। দেশে এখন প্লাস্টিক পণ্যের জনপ্রতি ব্যবহার বছরে ৭ দশমিক ৫ কেজি। ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু প্রণয়নের ১৬ বছর পরও আইনটি প্রয়োগের এবং আইনটি মান্য করার সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। যেকোনো কাঁচাবাজারে গেলেই দেখা যাবে প্লাস্টিকের ব্যাগের দোকান। প্লাস্টিকের একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বাজার বাড়ছে প্রতিদিনই। প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানি করে বাংলাদেশ। আর প্রতি বছর ১৭শ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশে প্রায় এক হাজার দুই শত কারখানায় নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন তৈরি হচ্ছে। এসব কারখানার বেশির ভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব টিস্যু ব্যাগ তৈরির মূল উপাদান পলিথিন হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বন্ধে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের ওপর জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা দরকার। সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ প্রশাসন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, সততা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এবং জবাবদিহি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবে বর্তমানে পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় এবারের বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মুজিববর্ষে শপথ করি, প্লাস্টিক দূষণ রোধ করি’ বাস্তবায়ন করতে সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
