নারী দিবস ক্ষমতার না সমতার?

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : নারীর ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করি বলে কারও কারও মুখে নারীবাদী তকমা শুনতে পাই। ‘নারীবাদী’ অথবা ‘পুুরুষবিদ্বেষী’ এ দুটোর কোনো তকমাই আমার পছন্দের নয়। তার চেয়ে আসুন, আয়োজন করে একটি গল্প শুনি, যে গল্পটি নারীর ক্ষমতায়ন নাকি সাম্যের তা আপনারা ঠিক করবেন। নারীর ব্যক্তিগতভাবে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সক্ষমতা ও দক্ষতা প্রয়োগে নারীর সার্বভৌমত্ব (কাজ করার পূর্ণ অধিকার এবং ক্ষমতা) কতটুকু সেটাই নারীর ক্ষমতায়নের সংজ্ঞাকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রূপদান করে বলে মনে করি।

শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী যে নারী সংসারে অর্থনৈতিক অবদান রাখে, তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তটি যখন স্বামী কর্তৃক গৃহীত হয়, সেই নারীর কতটা ক্ষমতায়ন হয়েছে সেটা বিবেচনার দাবি রাখে। আবার একজন নিরক্ষর নারীর উচ্চশিক্ষিত এবং মর্যাদাসম্পন্ন সন্তানরা যখন ভালোবেসে, শ্রদ্ধায় পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে মায়ের সিদ্ধান্তকেই মেনে নেয়, তখন সেই নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি আরেকভাবে বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু এমন দুই ধরনের ঘটনাই সমাজে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান, সেহেতু এই প্রেক্ষাপটগুলোকে বাইরে রেখে নারীর ক্ষমতায়নের গল্প আমরা বলতে পারি না। তাই ক্ষমতায়ন প্রত্যয়টি আমার কাছে বরাবরই আপেক্ষিক।

সার্বিকভাবে, সব ক্ষেত্রে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নারীর ক্ষমতায়নের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা প্রভৃতি বিষয় জড়িত। তবে এই চলকগুলো থাকলেই নারীর ক্ষমতায়ন ঘটবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, যা ওপরে উল্লিখিত দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যেতে পারে। আবার, অন্যদিকে নারীর ক্ষমতায়নের সামাজিক প্রেক্ষাপট রচিত না হলেও একজন নারী কেবলই তার মানসিক শক্তির জোরে নিজের ক্ষমতায়নের পথকে সুগম করতে পারে।

আমার মা একজন ষাটোর্ধ্ব নারী যিনি তার জীবনের সব সিদ্ধান্তের ভার আমার বাবার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, আমার বাবা আমাদের পারিবারিক আবহে পুুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা পারতপক্ষে কমই করেছেন। তিনি সারা জীবন আমার মায়ের পাশে থেকে তাকে সব ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ফলে আমাদের পরিবারে নারীর গল্পগুলো ঠিক যেন ক্ষমতায়নের নয়, সাম্যের অথবা সমতার। অনেক পরে এসে আমার কোনো এক সহকর্মীর কথার সূত্র ধরে বুঝতে পারি আমার চিকিৎসক মা আমাদের মানুষ করতে গিয়ে ক্ষমতায়নের চর্চা থেকে সরে এসে সাম্যের চর্চা করেছিলেন। তাই আমি মনে করি পরিবারে বা সমাজে নারীর সমতার প্রশ্নটি সব সময় কেবল তাকে এই অধিকার দেওয়ার বিষয় নয় চর্চারও বিষয়।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) নিজেদের জেন্ডার নীতিমালায় বলছে ‘জেন্ডার-সমতা বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে নারী-পুুরুষ সমান সুযোগ-সুবিধা ও সুফল ভোগ করে। ফলে তারা তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হয়।’

অন্যদিকে, প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচে বলেছেন, ‘ব্যক্তির কল্যাণের স্বাধীনতা মূলত ব্যক্তির যোগ্যতা অনুযায়ী তার কাজ করার মধ্যে নিহিত।’ সুতরাং, নারীর সমতা অর্জন বা ক্ষমতায়ন সব সময় দেওয়ার বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রেক্ষাপট তৈরিই থাকে, যেখানে নারীকে তার পুুরুষ সঙ্গীকে বোঝাতে হবে তার কাজ করার যোগ্যতা সম্পর্কে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি ছেলেশিশুকে চিনি, যার মা একজন চাকরিজীবী নারী। এক দিন গল্পের ছলে বাচ্চাটি আমাকে বলেছিল, ‘বাবারা সব সময় সন্তানের যত্ন নেয় এবং খাবার সংগ্রহ করে।’ আমি জানতে চাইলাম এটি তুমি কোথা থেকে জানলে? তোমার চাকরিজীবী মা তো তোমার সব বিষয়ে খেয়াল রাখেন। তার প্রত্যুত্তর ছিল এমন ‘হ্যাঁ, মা আমার সবই করেন। আমি জিওগ্রাফি চ্যানেলে অনেক পশু বাবাদেরও তা করতে দেখেছি।’ বুঝতে বাকি থাকল না বিশ্বায়নের এ যুগে মিডিয়ার কল্যাণে বাচ্চাটির যাপিত জীবন এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে শিগগিরই জেন্ডারিং ঢুকে যাবে। খুব সচেতনভাবেই নারী-পুুরুষের নির্ধারিত ভূমিকা থেকে তাকে বেরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও এ সমাজ, সংস্কার, রীতিনীতি তাকে পুুরুষ হিসেবেই গড়ে তুলবে!

চিরায়ত পুুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা করতে গিয়ে তার দ্বারাও তার পরিবারের নারী সদস্যটির যোগ্যতা উপেক্ষা করা অস্বাভাবিক কিছু হবে না। জন্মসূত্রে যে মানব শিশুটি নারী হয়ে জন্মায় এবং পরে তাকে তার কাজ করার যোগ্যতা বা ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে সমাজ তাকে ‘না পারার দলে’ ফেলে দিয়ে তাকেই আবার ক্ষমতায়নের গল্প শোনায়। কিন্তু শুরুটা যদি অন্য রকম হতো! যদি এমন হতো যে নারী তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার সমান সুযোগ পাচ্ছে, তাহলে ক্ষমতার এই ঘেরাটোপে সমতা আর ক্ষমতায়নের কথা হয়তো কোনো দিন তাকে উচ্চারণই করতে হতো না।

এবার আবার নিজের গল্পে ফিরে আসি। সমতার গল্প করতে গিয়ে আমার বাড়ির রান্নাঘরকে খুব বেশি মনে পড়ছে। আমাদের প্রত্যেক পরিবারে জেন্ডারিংয়ের সূতিকাগার তো সেটিই। আমাদের বাড়ির রান্নাঘরে সমতার গল্পের অনেক উদাহরণ থেকে একটি না টানলেই নয়। আমরা দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে আমি রান্না কমই পারি। একবার আমার বাবার একটি ঘোষণা ছিল অনেকটা এমন ‘আসো তোমাদের তিন ভাই-বোনের মধ্যে রান্নার প্রতিযোগিতা করা হোক। তিনি এও ঘোষণা দিলেন, আমি জানি এ প্রতিযোগিতায় আমার ছেলের রান্নাই বেশি ভালো হবে।’ তার এ কথায় যে দৃঢ়তা ছিল তাতে ক্ষমতায়ন নয়, নারীর সাম্যের স্বাদ আমি পেয়েছিলাম। তাই আমি বরাবরই বলতে ভালোবাসি আমাদের বাড়ির রান্নাঘর জেন্ডার নিরপেক্ষ রান্নাঘর।

আজকাল ফেইসবুকে আমরা অনেকেই নিজেকে বাবার রাজকন্যা বলে ভালোবাসা প্রকাশ করি। আমি সেসব রাজকন্যার গল্প জানি না। কিন্তু আমি আমার গল্প জানি যে কি না তার রাজা বাবাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারে বাবা আমি তোমাকে লবণের মতো ভালোবাসি। সে কথা শুনে আমার রাজা বাবা আমাকে পারুলের মতো বনবাসে পাঠাবেন না। বরং সেই ছোট থেকে আজ পর্যন্ত আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে লবণ আর চিনির ব্যবহার করতে হবে এবং কোন ক্ষেত্রে কতটুকু করতে হবে। এই লবণ আর চিনির উপযুক্ত ব্যবহার শেখাতে শেখাতে তিনি পারিবারিক আবহেই তার তিন সন্তানের সমতা নিশ্চিত করেছেন। তাই আমার চলতে-ফিরতে পারার যে সার্বভৌমত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে অধিকার (স্বাধীনতা শব্দটি ব্যবহারে অনাগ্রহী কারণ মানুষ কোনোভাবেই পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পারে না) তাকে ক্ষমতায়ন না বলে সমতার ফলাফল বলতেই আমি পছন্দ করি।

দিবস ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থবহ হয় না যতক্ষণ আমরা আমাদের বিশ্বাস, ধ্যানধারণায় অথবা আমাদের যাপিত জীবনে সেই প্রতিপাদ্যকে অনুশীলন না করি। হয়তো দেরিতে হলেও এমন চর্চা এক দিন হবেই পরিপূর্ণভাবে।… কারণ ভোর আসে, ভোর আসবেই …আসতেই হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

asrafiakram.soc@gmail.com