টেকনাফে ২২নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানীয় ও নিত্য ব্যবহার্য পানির তীব্র সংকট

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

সাদ্দাম হোসাইন : মিয়ানমার থেকে শরণার্থী হিসেবে আসা টেকনাফের ২২নং পুটিবনিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা পানি সংকটে ভুগছেন। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে (ক্যাম্প) পানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। উক্ত ক্যাম্পের ২২ হাজারের অধিক বিপন্ন রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পুরো ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা পানির জন্য হাহাকার।

সোমবার (১৮ এপ্রিল) সরেজমিনে এই ক্যাম্পে গিয়েই তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞাস করলে জোহরা খাতুন কথা প্রসঙ্গে বললেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তীব্র পানির সংকটে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। যে কারণে গোসলের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। জোহরা খাতুনের কথায়, ‘খাবার আর ওজুর পানি জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছি। গোসলের কথা তো ভাবাই যায় না। গেল ১০ দিন হয় গোসল হয়নি! ।
রোজার প্রসঙ্গ তুলতেই জোহরা বলেন, ‘রোজা তো রাখছিই। কিন্তু ইফতারে জুটে কেবল অল্প পরিমাণ পানি, আর সেহেরিতে নুন ভাত বা শাকভাত। মাছ-মাংসের স্বাদ তো ভুলেই গেছি। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা পানির।’

পানির সমস্যার কথা বললেন ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা রশিদাও। গোসল করেননি গত পাঁচ দিন, ভুগছেন খাবারের পানির কষ্টেও।

পথে যেতে যেতেই নজরে পড়ে ত্রাণের বস্তা মাথায় পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠছেন এক নারী। কপালে বেয়ে ঘাম ঝড়ছে, হাঁপাচ্ছেন । কথা বলতে চাইলে মাথা থেকে বস্তা নামিয়ে বসে পড়েন মাটিতেই। নাম তাহেরা (২৫)। স্বামীকে রাখাইন সেনারা মেরে ফেলেছে। ঘরে দিয়েছে আগুন। ছোট্ট দুই সন্তানের হাত ধরে প্রতিবেশীদের সাথে পাড়ি জমান এ দেশে। সবই এখন পুরোনো স্মৃতি। মোটা কালো বোরখার হাত খানিকটা তুলে বারবার চুলকাচ্ছেন। ফোসকা ঘায়ের মতো কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক পরপর গোসল করি। পানি নাই, গোসল করতে পারি না। হবেই তো।’

জোহরা, রশিদা আর তাহেরার কথার প্রতিধ্বনি পুরো রোহিঙ্গা শিবিরজুড়ে। রোহিঙ্গা শিবিরের সার্বিক বিষয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের ২২নং পুটিবনিয়া ক্যাম্পের সম্প্রসারিত এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ২২ হাজারের উর্ধেব। এর বড় অংশই নারী আর শিশু।

ক্যাম্পের বøক মাঝি (ক্যাম্পের দলনেতা) হামিদ হোসেন জানান, তার ক্যাম্পের একটি টিউবওয়েলেও পানি নেই। অনেকেই বাজার থেকে বোতলজাত পানি ক্রয় করে পান করছেন। অন্যান্য কাজের জন্য পানির অভাবে শিশু ও বৃদ্ধরা নাখাল হয়ে পড়ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগে। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এ সমস্যার কথা জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি।

একদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন দাতা সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত টিউবওয়েলের মধ্যে ৯০ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি ধারণ করেছে। কিছু কিছু টিউবওয়েলে পানির দেখা মিললেই তা দিয়ে চাহিদা পুরণ হচ্ছেনা। অপরদিকে যে এনজিও রোহিঙ্গাদের মাঝে পানি সরবরাহ করে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে পুটিবনিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেখা দিয়েছে খাবার পানির তীব্র সংকট। এতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পানির জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রোহিঙ্গা মাঝি জানান, এনজিওগুলো নামমাত্র টিউবওয়েল বসিয়ে কোটি কোটি টাকা দাতা সংস্থা থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেশীর বাড়ী থেকে অনেকেই পানি সরববারহ করছে। এসব এলাকায় স্থানীয়রাও রোহিঙ্গাদের পানি দিতে বিরক্তবোধ করছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগ খাল, নালা, পুকুর ও জলাশয়ের পানি ব্যবহার করছে। যে কারণে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু। তিনি আরো বলেন, এ ক্যাম্পে পানি সরবরাহ কাজে নিয়োজিত যে এনজিও সংস্থা আছে তাদেরকে জনপ্রতি ১০লিটার পানি দেওয়ার কথা থাকলেও তার স্থলে ৫/৬লিটার পানি সরবরাহ দিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রচন্ড তাপদাহ এবং রোজার মাসে এই অল্প পানি দিয়ে রান্না, ওজু গোসলসহ যাবতীয় কাজ কিভাবে করা যায় প্রশ্ন রাখেন এই মাঝি।

ওই ক্যাম্পে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত ব্রাকের এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, ক্যাম্পে বর্তমানে পানি বাহিত রোগ আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অতি সহসায় বৃষ্টিপাত না হলে রোহিঙ্গাদের পরিনতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

এব্যাপারে ২২নং পুটিবনিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি রফিক জানান, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনাবৃষ্টির ফলে পানির স্তর নিচে চলে যাওয়ার কারনে বর্তমানে ৯০শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। যে কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পানি সরবরাহ কাজে নিয়োজিত এনজিও সংস্থা অক্সফাম জনপ্রতি ১০লিটার করে পানি সরবরাহ করে থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পানি চাহিদা পুরনের জন্য আমরা ক্যাম্প ইনচার্জের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত এমএসএফ কে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি ক্যাম্পে পানি সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।

রোহিঙ্গাদের এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, প্রচন্ড তাপদাহ ও পানি সংকটে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে টেকনাফের ২২নং পুটিবনিয়া ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জীবন। সেহেরি-ইফতারের বিশেষ আয়োজন তো নেই; তার উপর তীব্র পানি সংকটে পবিত্র রমজানে সিয়াম সাধনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে তাদের। তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে তারা। গরমের তীব্রতার সাথে সাথে পানি সংকট আরো বেশি দুর্বিসহ করে তুলেছে তাদের জনজীবন। এমন নিদারুন কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে ঘরে ফেরার আকুতি বেড়েছে রোহিঙ্গাদের মাঝে। শিবিরগুলোতে মৌলিক খাবারের আগের মতো তেমন ঘাটতি নেই। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা খাবার বিতরণ করছে। তবে পানি সংকট চরমে। বিশুদ্ধ পানির খুব অভাব। একটি সেবামূলক সংস্থা প্রতিদিন ক্যাম্পে পানি বিতরণ করে থাকে তবে তা যথেষ্ট নয়।####