টেকনাফে পাহাড়ে সাত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ; জিম্মি আশ্রিত রোহিঙ্গা ও সাধারণ মানুষ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

বিশেষ প্রতিনিধি,কক্সবাজার : টেকনাফে গহিন পাহাড়ে ডজনখানেক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে আশ্রিত রোহিঙ্গা ও তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ডাকাতদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা সাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে সাতটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প। তাদের অপকর্ম দমন করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এমনই পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে সাত রোহিঙ্গা ডাকাত।

টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা ও শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ে গতকাল ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব-১৫-এর একটি দল। এ সময় ডাকাতদলের সঙ্গে র‌্যাবের গোলাগুলির ঘটনায় সাত ডাকাত নিহত হয়। তাদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলো জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নুর হোসেন ওরফে নুরাইয়া, ফারুক ওরফে ডাকাত ফারুক, শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইমরান ও মোহাম্মদ আলী।

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, শালবাগান ও জাদিমুরা সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা ডাকাতদলের উপস্থিতির গোপন খবরের ভিত্তিতে র‌্যাবের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। র‌্যাব সদস্যরা রোহিঙ্গা ডাকাতদের আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছলে তারা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি ছোড়ে। এতে চারজন র‌্যাব সদস্য আহত হন।

পরে র‌্যাব আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলির পর ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিত্সক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পরে ঘটনাস্থল তল্লাশি করে তিনটি বিদেশি পিস্তল, সাতটি ওয়ান শুটার গান, পিস্তলের ১২ রাউন্ড গুলি ও শটগানের ১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাত রোহিঙ্গা ডাকাতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গা ডাকাতদের আস্তানায় পুলিশেরও বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলায় কুখ্যাত বনদস্যু রোহিঙ্গা আব্দুল হাকিম ডাকাতের তত্ত্বাবধানে জাদিমুরা, শালবাগান ও নয়াপাড়া, আলীখালী, লেদা, শাপলাপুর, ঊনছিপ্রাং রইক্ষ্যং ও চাকমারকূল ক্যাম্পে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গঠন করা হয়। এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তারা বিশেষত জাদিমুরা, শালবাগান ও নয়াপাড়া ক্যাম্পের পাশের গহিন বনে অবস্থান নিয়ে ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাদকের চালান খালাস, চোরাচালান, ছিনতাই, অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করে সাধারণ রোহিঙ্গা এবং পার্শ্ববর্তী জনসাধারণকে জিম্মি করে রেখেছে।

বর্তমান সময়ে শালবাগান ক্যাম্প সংলগ্ন গহিন পাহাড়ে দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ডাকাত জকির, ছৈয়দ হোছন ওরফে পুতিয়া, খাইরুল আমিন, সালমান শাহ, মো. ইসলাম ধইল্যা ও নুরুল ইসলাম ওরফে নুর সালামের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি ডাকাতদল অবস্থান করছে। এই সন্ত্রাসীরা সম্প্রতি বাহারছড়া থেকে দুই নারী ও হোয়াইক্যং কম্বনিয়াপাড়া থেকে চাচা-ভাতিজাকে অপহরণ করে ১৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়, শালবাগান ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে অভিযান চলাকালে র‌্যাব সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ, গত সপ্তাহে শালবাগান রোহিঙ্গা বসতিতে জুয়ার আসর থেকে জাদিমুরার এক ব্যক্তিকে আড়াই লাখ টাকাসহ অপহরণ করে।

জানা গেছে, সন্ত্রাসী ডাকাতরা নির্বিঘ্নে অপকর্ম চালানোর উদ্দেশ্যে ক্যাম্পে নিয়োজিত ব্লক মাঝি ও কতিপয় ভলান্টিয়ারকে দলে ভিড়িয়েছে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করলেই সন্ত্রাসীদের কাছে আগাম খবর পৌঁছে যায়। ফলে অনেক সময়ই অভিযান ফলপ্রসূ হয় না।

এ অবস্থায় র‌্যাবের অভিযানে সাত রোহিঙ্গা ডাকাত নিহত হওয়ার খবরে ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করে। সশস্ত্র ডাকাতদলগুলোর বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরো কঠোর পদক্ষেপের দাবি তাদের।

ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা বলে, মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাইলেও নিরুপায় হয়েই এসব অপরাধীর কথায় উঠাবসা করতে হয়। শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, ডাকাতদলগুলো দিনদুপুরে ক্যাম্পের ভেতরে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্রবাজি করে থাকে। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে না। জাদিমুরা ক্যাম্প এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র ডাকাতদের ধরতে র‌্যাবের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা দরকার।

র‌্যাব-১৫-এর টেকনাফ সিপিসি-১-এর কম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, টেকনাফের জাদিমুরা, শালবাগান ও নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন গহিন পাহাড়ে একাধিক সশস্ত্র ডাকাতদল সক্রিয় ছিল। ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের কাছে জিম্মি ছিল। তাদের ধরতেই র‌্যাব অভিযানটি পরিচালনা করে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ে সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক ডাকাত জকির অতিমাত্রায় দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছে। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে ডাকাত শুক্কুরসহ বেশ কয়েকজন। পাশাপাশি চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে এলাকার কিছু মাদক কারবারি ফেরারি হয়ে ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।’

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনও জানান, শালবাগানকেন্দ্রিক দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ডাকাত জকির বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে রয়েছে ২৫ থেকে ৩০ জন। মূলত তারা ছাড়া পাহাড়ে কোনো সশস্ত্র সন্ত্রাসী নেই।

সুত্র : দৈনিক কালের কণ্ঠ।