Monday, August 8, 2022
Homeঅর্থ-বানিজ্যটেকনাফে পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদকৃত পুষ্টিগুণে ভরপুর পেয়ারা বাজারে আসছে

টেকনাফে পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদকৃত পুষ্টিগুণে ভরপুর পেয়ারা বাজারে আসছে

হুমায়ূন রশিদ : চলতি বর্ষায় পেয়ারার মৌসুমে টেকনাফের স্থানীয় পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদকৃত বিভিন্ন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ বিভিন্ন প্রজাতির পেয়ারা বাজারে আসতে শুরু করেছে। আমরা এই ভরা মৌসুমে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ পেয়ারা খেয়ে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি হতে মুক্ত থাকতে পারি।

সরেজমিনে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, হ্নীলা, টেকনাফ সদর ও বাহারছড়া এলাকার স্থানীয় পাহাড় ও টিলায় বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ শুরু করে স্থানীয় কৃষকেরা। পেয়ারা চাষ উপযোগী পরিবেশ, ভাল ফলন হওয়ায় অন্যান্য শাক-সবজি এবং ফলের পাশাপাশি পেয়ারা চাষের দিকে ঝুঁকছে স্থানীয় চাষীরা। কৃষকেরা শ্রম দিয়ে ফল উৎপাদনের পর যেমন আয় বাড়ছে ; তেমনি মানুষের দেহে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে। টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ২০হেক্টর জমিতে সরু বকাটি,থাই এবং স্থানীয় প্রজাতির পেয়ার চাষ হচ্ছে।

টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিউল আলম জানান,টেকনাফে ২০হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। টেকনাফের পাহাড়ি এলাকার মাটি উর্বর এবং পেয়ারা চাষের জন্য উপযোগী। বানিজ্যিকভাবে উন্নত পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষাবাদ করলে চাষীরা আরো লাভবান হবে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে আসছি।

এদিকে পেয়ারা চাষী হ্নীলা লেচুয়াপ্রাংয়ের ছৈয়দ হোছন জানান,আমরা ১২/১৪জনে বড় কয়েকটি পাহাড়ে বিভিন্ন জাতের পেয়ারার চাষ করেছি। ফলন ভাল হয়েছে। বাহিরের অন্য পেয়ার চেয়ে আমাদের এলাকার পেয়ারা সুস্বাদু। এখন আস্তে আস্তে পেয়ারা বাজারে আসতে শুরু করেছে।

লেদা এলাকার পেয়ারা চাষী আব্দুর রহমান হাশেমী জানান, দুই একর পাহাড়ি ঢালু জমিতে পেয়ারার চাষ হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে আমি যেতে না পারলেও অপর লোকজন দিয়ে কাজ চালায়। এখন আমরাও পটিয়ার মতো পেয়ারা চাষ, উৎপাদন, খাওয়া এবং বিক্রি করে মানুষের চাহিদা মিটিয়ে থাকি।

পেয়ারা বিক্রেতা নুর মোহাম্মদ জানান,স্বাদে-গুণে ভাল হওয়ায় দেশীয় পেয়ারার চাহিদা রয়েছে। আস্তে আস্তে পেয়ারা বাজারে আসতে শুরু করেছে। বিক্রিও হচ্ছে।

পেয়ারা ক্রেতা আবছার ও সাদ্দাম জানান, আমরা তো পান-সিগারেট খাইনা তাই মুখের দূর্গন্ধ দূর করতে এবং মাড়ি শক্ত রাখতে বেশীর ভাগ পেয়ারা চিবায়।

অপরদিকে পুষ্টিবিদদের তথ্যমতে পেয়ার একটি সুস্বাদু ফল। পৃথিবীতে ১০০প্রজাাতির বেশী পেয়ারার জাত রয়েছে। আমাদের দেশেও বেশ কয়েক জাতের পেয়ারা পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকটি ফলের মধ্যে তাঁর কুদরতের যে বৈশিষ্ট্য রেখে দিয়েছেন তা চিন্তা করলে তাঁর শুকরিয়া আদায় না করে পারা যায় না। পেয়ারা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়,ক্যান্সার প্রতিরোধ করে,চোখ ভাল রাখে,পেটের জন্য উপকারীসহ আরো কত কি উপকারী। পুষ্টমানে কমলার চেয়ে পেয়ারার বেশী। পেয়ার চামড়ায় কমলা লেবুর চেয়ে ৫ গুন বেশী ভিটামিন সি রয়েছে। পেয়ারায় ভিটামিন এ এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্সও পাওয়া যায়। ১০০গ্রাম পেয়ারার মধ্যে শক্তি ৬৮কিঃ ক্যালরী, ভিটামিন সি ৩০২ মিঃ গ্রামঃ, ক্যালশিয়াম ৩০মিঃ গ্রাম, ফসফরাস ২৯মিঃ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ১৭.১০গ্রাম, প্রোটিন ১.০০গ্রাম,ভিটামিন এ ২৫০ আই ইউ, থিয়ামিন ০.০৭ গ্রাম, নিয়াসিন ১.২০ মিঃ গ্রাম, আয়রন ০.৩ মিঃ গ্রাম, লিপিড ১.০০গ্রাম, সোডিয়াম ২ গ্রাম, পটাশিয়াম ৪১৭ মিঃ গ্রাম, শর্করা ১৪গ্রাম, চিনি ৯গ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ২২ মিঃ গ্রাম, জিংক ০.২৩ মিঃ গ্রাম, লাইকোপেন ৫২০৪ মাইক্রোগ্রাম রয়েছে।

পেয়ারা খেলে কি কি রোগ ভাল হয় জেনে নিই :

১। অরুচি দূর করতে : ডাঁসা পেয়ারা চিবালে অরুচি চলে যায়। আবার ডাঁসা পেয়ার ভাতে সিদ্ধ করে পানিতে কচলিয়ে ছেঁকে বীজ ফেলে দিতে হবে। তারপর ৩ চা চামচ পেয়ারার জুস নিয়ে স্বাদমত লবন-চিনি মিশিয়ে খেলে অরুচি দূর হয়ে যায়।

২। মুখের দূর্গন্ধ দূর করতে : যাদের মুখে দূর্গন্ধ আছে তারা বুঝেন তার কত জ¦ালা। তবে এই মৌসুমে বেশী বেশী পেয়ারা খেলে মুখের দুর্গন্ধ চলে যায়। আর পেয়ারা চিবালে দাঁত ও মাড়ির বেশ উপকার হয়।

৩। মাড়ির রক্তপাত বন্ধ করতে : অনেকের দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত ঝরে। পেয়ারা খেলে মাড়ির রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

৪। কোষ্ঠকাঠিন্য : ১-২ দুটি পাকা পেয়ারা রাতে খাওয়ার পর খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ভাল হয়ে যায়।

৫। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে : পেয়ারাতে প্রচুর পরিমান পটাশিয়াম ও ভিটামিন সি আছে। যা হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক রাখে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

৬। চোখের রোগে : পেয়ারায় ভিটামিন এ রয়েছে। পেয়ারা চোখের কর্নিয়া সুস্থ রাখে এবং রাত কানা রোগ প্রতিরোধ করে।

৭। রোগ প্রতিরোধ : একটি পেয়ারায় ৪টি কমলা লেবুর সমান ভিটামিন সি রয়েছে। ভিটামিন সি আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে শরীর বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের শক্তি লাভ করে।
৮। ক্যান্সার রোধ : পেয়ারার মধ্যে অনেক ধরনের এন্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে। যা শরীরে ক্যান্সার কোষ তৈরীতে বাঁধা দেয়। পেয়ারা প্রোস্টেট ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সাার প্রতিরোধ করে।

৯। ডায়াবেটিস : নিয়মিত পেয়ারা খেলে ডায়াবেটিস টাইপ-২ এর ঝুঁকি কমায়। পেয়ারার মধ্যে যে আঁশ রয়েছে তা শরীরের চিনি শোষন করে।

১০। ত্বকের রুক্ষ ভাব : পেয়ারা ত্বকের রুক্ষ ভাব দূর করে ত্বককে মসৃণ করে। এমনকি শীতের পা ফাঁটাও ভাল করে দেয়।

১১। ঠান্ডাজনিত রোগ : এ্যাজমা, ঠান্ডা কাশিতে পেয়ারার জুস খুব উপকারী। ব্রংকাইটিসে পেয়ারা উপকারী। পেয়ারায় আয়রণ ও ভিটামিন সি থাকায় এটি শ্লেষ্মা কমিয়ে দেয়।

১২। ডায়রিয়া প্রতিরোধে : যারা নিয়মিত পেয়ারা খান তাদের ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

১৩। ওজন কমানো : সবুজ ফলমূল শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। পেয়ারায় আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও বি । যা মানুষের শরীরের মেদ ঝরিয়ে ওজন কমাতে সাহায্য করে।

১৪। গর্ভবর্তী মায়েদের জন্য : পেয়ারায় থাকা ফলিক এসিড গর্ভস্থিত শিশুর স্নায়ুতন্ত্রী গঠনে সাহায্য করে। তাই গর্ভবর্তী মায়েদের জন্য পেয়ারা উপকারী। আসুন এই ভর মৌসুমে প্রতিদিন অন্তত একটি পেয়ারা খাই এবং সুস্থ থাকি। ###

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments