Monday, January 17, 2022
Homeজাতীয়কাজ না পেয়েই পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ

কাজ না পেয়েই পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ পেতে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া একটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের ভিত্তিতে বহুল আলোচিত ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ করা হয়েছিল। দৃশ্যত কাজ না পাওয়ার হতাশা থেকেই এ অভিযোগ আনা হয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র অভিযোগের মামলায় কানাডার ওন্টারিওর সুপিরিয়র কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারপতি আয়ান নরডেইমারের দেয়া রায়ে এ তথ্য ওঠে এসেছে।

দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ পেতে কানাডাভিত্তিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের এক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ তিনজন দুবাইয়ে বৈঠক করেছিলেন বলে যে দাবি করা হয়েছিল, সেটাও অসত্য প্রমাণিত হয়েছে।

গল্প-গুজবের ভিত্তিতে এ দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল জানিয়ে তা খারিজ করে রায় দেন আদালত।

২০১১ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শক হিসেবে এসএনসি-লাভালিনসহ আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম সুপারিশ করেছিল পরামর্শক নিয়োগ মূল্যায়ন কমিটি।

বাকি চারটি প্রতিষ্ঠান হলো- যুক্তরাজ্যের হালক্রো গ্রুপ, নিউজিল্যান্ডের একম অ্যান্ড এজেডএল, জাপানের ওরিয়েন্টাল কন্সালট্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড এবং যুক্তরাজ্য-নেদারল্যান্ডের যৌথ প্রতিষ্ঠান হাইপয়েন্ট রেন্ডাল।

সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসএনসি-লাভালিন এক নম্বরে উঠে আসে।

তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণের আগেই পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা, এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে বিশ্বব্যাংক।

পরে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সি বিভাগ পদ্মা সেতু প্রকল্প সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ চারজন টিপস্টারের (গোপন তথ্যের আভাসদাতা) কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশকে (আরসিএমপি) জানায়।

এ অভিযোগ পাওয়ার পর এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে আরসিএমপি। পরে অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।

গত জানুয়ারিতে এ মামলার রায় দেন বিচারপতি আয়ান নরডেইমার। রায়টি শুক্রবার প্রকাশ করে আদালত।

এ রায়ের বরাতে কানাডীয় সংবাদমাধ্যম ‘টরন্টো স্টার’ জানায়, বিশ্বব্যাংক চারজন টিপস্টারের তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করলেও শুধু একজন টিপস্টারের সঙ্গে কথা বলেছে আরসিএমপি।

এই টিপস্টার হলেন চারজনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার কাছ থেকেই টেলিফোনের মাধ্যমে অভিযোগের বেশির ভাগ তথ্য সংগ্রহ করেছে আরসিএমপি।কিন্তু এক ও তিন নম্বর টিপস্টারের সঙ্গে পুলিশ কখনোই কথা বলেনি।

রায়ে বিচারপতি বলেন, আদালতে উপস্থাপিত দলিলপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- বাকি তিন টিপস্টার যেসব তথ্য দিয়েছে তা বিভিন্ন সূত্র থেকে পেয়েছে। কিন্তু আরসিএমপি ওই সূত্রগুলোর কারও সঙ্গেই কথা বলেনি।

রায়ে বলা হয়, যেহেতু আরসিএমপি কখনোই অন্য টিপস্টারদের যাচাই করেনি, তাই এটি স্পষ্ট নয় যে চারজনই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে নাকি শুধু দুজন ব্যক্তি পৃথক ইমেইল ব্যবহার করে এ সব তথ্য দিয়েছে।

এদিকে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই দ্বিতীয় টিপস্টার নিজেই পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পেতে দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। তবে দরপত্র প্রতিযোগিতায় না টিকতে পেরে তিনি হতাশ হয়েছিলেন বলে জানান বিচারক।

নরডেইমার দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ করতে দুবাইয়ে একটি বৈঠক হয়েছে বলে দ্বিতীয় টিপস্টারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করায় আরসিএমপির সমালোচনা করেছেন বিচারক।

ওই টিপস্টারের দাবি করেছিল, পদ্মা সেতুর কাজ পাওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় উপনীত হতে দুবাইয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। এতে এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস নিশ্চিতভাবে উপস্থিত ছিলেন বলে এক সূত্রের বরাতে জানায় টিপস্টার।

আরসিএমপি আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে প্রথমে বলেছিল, কেভিন ওয়ালেসসহ তিনজন দেশের বাইরে ছিলেন এবং তারা কানাডার পিয়ারসন বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেছেন। পরে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সিও (সিবিএসএ) তাদের এই গন্তব্যের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

সিবিএসএ-কে পরে আরসিএমপি জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, ওই সময়ে ওয়ালেস দুবাই যাননি। কিন্তু টেলিফোনে আঁড়ি পেতে পাওয়া তথ্য ব্যব্হারের অনুমতি চেয়ে করা নতুন প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করেনি আরসিএমপি।

বিচারক বলেন, ‘আমার মতে প্রথমে ওয়ালেসের দুবাই ভ্রমণের এই তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল আদালতকে প্রভাবিত করার জন্য। এমনকি দুবাই ভ্রমণের এই বাড়তি অভিযোগের তথ্য দ্বিতীয় টিপস্টার সরবরাহ করেছিল দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণের জন্য।

এদিকে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে আরসিএমপি আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের টেলিফোন রেকর্ড ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে যে তিনটি আবেদন করেছিল তাও বাতিল করে দিয়েছেন আদালত। আড়ি পেতে এসব রেকর্ড সংগ্রহ করার জন্য পুলিশের সমালোচনাও করেন আদালত।

উল্লেখ্য, আরসিএমপির মামলায় মোট পাঁচজন অভিযুক্ত ছিলেন। এরমধ্যে শুক্রবারের রায়ে এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ এবং বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডীয় ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী ভূঁইয়া খালাস পেয়েছেন।

এর আগে মামলা চলাকালেই এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল এবং বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর নাম বাদ দেন আদালত।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments