Thursday, January 20, 2022
Homeআন্তর্জাতিকওবামাকে লেখা চিঠিতে যা বললেন ৯/১১ হামলার 'হোতা'

ওবামাকে লেখা চিঠিতে যা বললেন ৯/১১ হামলার ‘হোতা’

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে লেখা এক চিঠিতে তাকে ‘প্রধান সাপ’ এবং ‘দুর্বৃত্ত’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার আত্মস্বীকৃত পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদ।

ওই চিঠিতে টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন খালিদ। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এ হামলা বয়ে এনেছে। তাদের ধ্বংসাত্মক নীতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা হয়েছে।

২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি ১৮ পাতার দীর্ঘ চিঠিটি লেখেন খালিদ। তবে দুই বছর ধরে চিঠিটি আটকা পড়েছিল।

তবে গুয়ান্তামো বে কারাগারের একজন সামরিক বিচারক চিঠিটি হস্তান্তরের আদেশ দিলে দুই বছর পর ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েকদিন আগে হোয়াইট হাউজে চিঠিটি ওবামার হাতে পৌঁছায়।

বুধবার মিয়ামি হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়।

ওবামাকে খালিদের চিঠি লেখার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিষয়ক অ্যাটর্নি ডেভিড নিশ্চিত করেছেন।

নিচে খালিদের চিঠির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরা হলো:

মাকির্ন নীতি প্রসঙ্গে

চিঠিতে ওবামাকে দুর্বৃত্ত সম্বোধন করে খালিদ শেখ বলেন, ‘আপনারা আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান আমেরিকানদের উপর পরিচালিত নৃশংস-অসভ্য হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছেন। আপনারা ভিয়েতনাম, কোরিয়া, টোকিও, হিরোশিমা, নাগাসাকি ড্রেসডেন এবং ল্যাটিন আমেরিকায় অপরাধ করেছেন। আপনারা চীনের স্বৈরশাসক চিয়াং কাই শেক এবং মেক্সিকোর স্বৈরশাসক সান্তা আনাকে সমর্থন করেছেন। এসব অপরাধের জন্য আপনারা নিজেদের বিচার করেনি, বরং আপনারা বিচার থেকে পালিয়ে গেছেন।

কিন্তু আল্লাহ আমাদেরকে নিজেদের রক্ষায় সাহায্য করেছেন। আমাদের দেশে অপরাধ করার জন্য আমরা আপনাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এবং বাণিজ্যিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছি। জাপান, জার্মানী, ইটালী বা যেখানে খুশি আপনারা নিজেদের সামরিক ঘাঁটি গাড়তে পারেন। কিন্তু মুসলিম দেশের ভূমিতে কাফেরদের সামরিক ঘাঁটি কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে

ওবমাকে লেখা চিঠিতে খালিদ লেখেন, গত ৬০ বছর ধরে আপনারা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হত্যা করছেন। আপনারা ৪০ লাখ মুসলমানকে নিজেদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। আপনারা তাদের ঘর, স্কুল, মসজিদ এবং মার্কেট ধ্বংস করতে ইসরাইলকে সামরিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সহায়তা করেছেন। আপনারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে ইসরাইলের সব অপরাধকে সুরক্ষা দিয়ে আসছেন।

এই ৬০ বছরের প্রতিশোধ স্বরূপ ৯/১১ ঘটিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়ে আপনাদের জব্দ করতে এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার বিষয়ে আপনাদের দীর্ঘদিনের ভাওতাবাজি মানুষের সামনে তুলে ধরতে সেদিন আল্লাহ আমাদের সহায়তা করেছেন।

মিডিয়া এবং আব্রাহাম লিংকন প্রসঙ্গে

আপনি এবং আপনাদের গণমাধ্যম প্রকৃত সত্য বিকৃত করায়, বিভিন্ন বিষয়কে রংচং মাখিয়ে নিজের জাতিকে ধোঁকা দিতে এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে আপনারা আসলেই ওস্তাদ।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, আপনারা সমগ্র জনগণকে কিছু সময়ের জন্য এবং কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবে, কিন্তু আপনারা সব সময় সব মানুষকে বোকা বানাতে পারবেন না। ‘আমরা ৯/১১ তে আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করিনি, বরং আপনারা এবং আপনাদের দেশের স্বৈরশাসকরাই হামলাকারী।’

ইরাক যুদ্ধ প্রসঙ্গে

যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসন চালিয়ে মুসলিম দেশ ইরাককে রক্তে জবজবে একটি জনপদে পরিণত করেছে বলে চিঠিতে লিখেছেন শেখ খালিদ। তিনি ওবামাকে লিখেছেন, ‘আপনার পূর্বসুরি (বুশ) কি ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পেয়েছে? না, কিন্তু তারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন দূতাবাসের জায়গা খুঁজে পেয়েছে, যার মাধ্যমে ইরাকি জনগণে জ্বালানি সম্পদ থেকে মুনাফা লুটতে থাকা তেল কোম্পানি লোকদের সেবা দেয়া হয় এবং এই মুনাফার ভাগ পাচ্ছে আপনার হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে থাকা লবিস্ট এবং প্রেশার গ্রুপ। আপনার পূর্বসুরি কি ইরাক সরকার এবং আলকায়েদার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ খুঁজে পেয়ে দেখাতে পেরেছে, যেমনটি আপনার গোয়েন্দা সংস্থা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্ভ্রান্তের মতো বারবার বলে বেড়ায়? আপনি এবং আপনার সহযোগীরা ইরাককে হাজারো ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছেন।

বেসামরিক মানুষ হতাহত প্রসঙ্গে

৯/১১-এর হামলার পরিকল্পনাকারী খ্যাত খালিদ শেখ চিঠিতে লিখেছেন, যুদ্ধ এবং শান্তির ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ শেখ ওসামা বিন লাদেনকে আল্লাহ ক্ষমা করুন। তিনি ৮০ লাখেরও বেশি বাসিন্দার শহর নিউইয়র্কের কোনো স্কুল, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম বা চার্চকে হামলার জন্য বেছে না নিয়ে আপনাদের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র টুইনটাওয়ারকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার সাফল্য দেখিয়েছিলেন। এর সঙ্গে মার্কিন বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুর তুলনা করে দেখুন যে আপনাদের বহু বোমা হামলার শিকারদের শতভাগই হলো নিষ্পাপ শিশু। উদাহরণ স্বরূপ আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশের ঘটনা দেখুন, সেখানে কাঠকুড়ানোর সময় বিমান হামলা চালিয়ে ১২ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ইয়েমেনের নানগারহার প্রদেশে বিয়ে বাড়িতে হামলা চালিয়ে ২৩জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২০১০ সালে আফগানিস্তানে রাতের বেলা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী হামলা চালিয়ে ৮০ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, জাতিসংঘ নিহতের সংখ্যা ৮০ জন বললেও প্রকৃত সংখ্যা চারশ’ জনেরও বেশি।

বিন লাদেনকে হত্যা প্রসঙ্গে

আলকায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে ২০১১ সালে পাকিস্তানে অভিযান চালিয়ে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিল বাহিনী। এ ব্যাপারে চিঠিতে খালিদ শেখ বলেন, শেখ ওসামাকে বিনা বিচারে হত্যার সময় সমগ্র বিশ্ব দেখেছে আপনাদের নৈতিকতার মান কেমন এবং কিভাবে আইন মেনে চলার দাবিদার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিন লাদেনের লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও বিশ্ববাসী দেখেছে।

নিজের পরিণতি সম্পর্কে

খালিদ শেখ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে লেখা চিঠিতে নিজের পরিণতি সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন, ৯/১১ হামলার জন্য মৃত্যুদণ্ড হলেও ভীত নই। আমি হাসিমুখেই মৃত্যুকে মেনে নেব। আল্লাহ, নবী (সা.), ওসামা বিন লাদেন এবং বিশ্বব্যাপী আমার যেসব সাথী জুলুমের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন তাদের সঙ্গে দেখা হবে ভেবেই ভালো লাগছে। আর যদি মার্কিন আদালত আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় তাহলে বাকি জীবনটা কারাগারে আল্লাহর এবাদত করে পার করবেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন খালিদ।

উল্লেখ্য, শেখ খালিদ ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা এ অ্যান্ড টি ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি দুই সন্তানের জনক।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments