এতিমকে গড়ে তুলুন পরম যত্নে

: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ১২ মাস আগে

হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর : যে শিশুর পিতা ইন্তেকাল করেছে, পরিভাষায় তাকে এতিম বলা হয়। পিতৃহারা হওয়ার কারণে এতিমরা শৈশব থেকেই অকৃত্রিম পিতৃস্নেহ ও মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা, তাদের যথাযথ অধিকারসমূহ আদায় করা ইসলামের মহান নির্দেশ। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা ইবাদত করো একমাত্র আল্লাহর, তার সঙ্গে অপর কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সঙ্গে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির ও নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-অহঙ্কারীকে।’ -সুরা নিসা : ৩৬

বর্ণিত আয়াতে আল্লাহ নিজ ইবাদতের নির্দেশ প্রদানের পরপরই পিতা-মাতাসহ যাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে এতিমরা অন্যতম। ইসলামে এতিমের প্রতি সহানুভূতিপরায়ণতা ও যতœশীলতাকে কী ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আলোচ্য আয়াতটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আয়াতের শেষাংশে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।’ আয়াতের এ অংশটি পূর্ববর্তী বক্তব্যের উপসংহার। কারণ আয়াতে যাদের অধিকার সম্পর্কে তাগিদারোপ করা হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে ওইসব লোকই অবজ্ঞা প্রদর্শন করে যাদের মন-মানসিকতায় আত্মগরিমা, অহমিকা ও দাম্ভিকতা বিদ্যমান। এতেই প্রতীয়মান হয়, এতিমদের অবজ্ঞা, অবহেলা, অনাদর করা চরম দাম্ভিকতা ও অহংবোধের বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং এতিমের প্রতি অসদাচরণকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ যাকে অপছন্দ করেন তার ভয়াবহ পরিণাম অবধারিত।

এতিমের প্রতি অসদাচরণকারীকে আল্লাহ কেয়ামত দিবসের অস্বীকারকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি কি দেখেছেন তাকে যে কেয়ামত দিবসকে মিথ্যা বলে? সে সেই ব্যক্তি যে এতিমকে গলা ধাক্কা দেয়।’ -সুরা মাউন : ১-২

আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘(হে নবী)! তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে এতিম সংক্রান্ত হুকুম। বলুন, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করাই উত্তম। আর যদি ব্যয়ভার নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নাও তাহলে মনে করো তারা তোমাদের ভাই।’ -সুরা বাকারা : ২২০

এ আয়াতে এতিমের সঙ্গে সদাচরণের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতিমদের সহায়-সম্পদের ওপর স্বার্থপরদের যে ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয় সে বিষয়ে কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। ভালো মালামালের সঙ্গে খারাপ মালামালের অদলবদল করো না। আর তাদের সম্পদের সঙ্গে নিজেদের ধন-সম্পদ সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ।’ -সুরা নিসা : ০২

একই সুরার ১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যারা এতিমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং সত্বরই তারা অগ্নিতে প্রবেশ করবে।’ এ আয়াতের তাফসিরে এসেছে, কেয়ামত দিবসে যখন এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীকে পুনরুত্থান করা হবে তখন চোখ, নাক, কান ও মুখ দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকবে। যে-ই তাকে দেখবে, চিনে ফেলবে সে এতিমের সম্পদ ল্ণ্ঠুনকারী।

এভাবে এতিমের সঙ্গে অসদাচরণের ভয়াবহ পরিণাম ও সদাচরণের উত্তম প্রতিদান সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে অনেক বর্ণনা রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব (এসময় তিনি তর্জনি ও মধ্য অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং এ দুই আঙুলের মধ্যে সামান্য ফাঁক রাখেন)।’ -সহিহ বোখারি

এতিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের যথার্থ হক আদায়ে যতœবান থাকার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ ও নবী কারিম (সা.)-এর শাশ্বত শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে সমাজে কোনো এতিম নিগৃহীত, বঞ্চিত ও মজলুম হতো না। হালসময়ে ধনবানেরা প্রাচুর্যের পাহাড় গড়লেও পথে-প্রান্তরে, মাঠেঘাটে, খোলা আকাশের নিচে, জীর্ণশীর্ণ ছোট্ট কুটিরে অনেক এতিম অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। একদিকে ধনীদের খাবারের বাহারি আয়োজন, অপরদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ফুটপাতের পাশে থাকা ডাস্টবিন থেকে অনেক এতিম-অসহায়ের খাবার কুড়িয়ে খাওয়ার করুণ দৃশ্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। এভাবে অনেক এতিম অযতœ-অবহেলায় মানবিক স্নেহবাৎসল্য ও সঠিক দিশা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে বিপথগামী হয়ে অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা কি পারি না এতিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে? এতিমদের মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল হৃদয়ে তাদের আগলে নেওয়া কি মানবিক সমাজের কর্তব্য নয়? পিতৃস্নেহের পরশবঞ্চিত মজলুম এতিমদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক কর্তব্য নয় কি? আমরা কি পারি না ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত এতিমদের মুখে হাসি ফুটাতে? আসুন! ইসলামের শিক্ষাকে ধারণ করে এতিমদের প্রতি মায়া-মমতার হাত প্রসারিত করি। তাদের প্রতি বিস্তৃত করি মানবিক অভিভাবকত্বের কোমল ছায়া। সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করি তাদের। পরম যত্নে প্রতিজন এতিমকে গড়ে তুলি একেকটি অমূল্য রত্নে।