ঋতু পরিবর্তনে অ্যালার্জির রহস্য

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ২ years ago

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ‘সিজন চেঞ্জ’ হলেই ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে এর তীব্রতা। কেন এমন হয়, সায়েন্টিফিক আমেরিকা অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

ইদানীং একটি কথা শোনা যায়

ঢাকায় বসবাসরতদের মুখ থেকে। সেটি হলো, ঋতু পরিবর্তনকালে শারীরিক সমস্যায় জ্বর এখন অনেক তীব্র হয়। দ্রুত ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে চলে যায়। কয়েক বছর আগে এমনটা হতো না। তখন জ্বর উদ্বেগ তৈরি করত না। বিশ্বজুড়ে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনকে।

সাধারণত ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রায় তারতম্য দেখা দেয়। বিভিন্ন গাছে ফুল ফোটে। সে সবের রেণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এসব রেণু মানুষের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি তৈরি হয়। যা নানা অস্বস্তির কারণ। সায়েন্টিফিক আমেরিকা বলছে, হাঁচি, সর্দি, নাক এবং চোখ চুলকানি সাধারণত মৌসুমি অ্যালার্জির সঙ্গে আসে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব শারীরিক সমস্যা আরও তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এর কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। যার ফলে ঋতু পরিবর্তন দীর্ঘ হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চতর কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে গাছ বেশি মাত্রায় পরাগ রেণু ছাড়ছে বাতাসে। এসব উদ্ভিজ উপাদান মানুষের তবককের সংস্পর্শে এলে, অথবা নাক ও চোখে ঢুকলে অ্যালার্জির সমস্যা তৈরি হয়। গবেষষকরা বলছেন, এই অ্যালার্জি হয় মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকায় সম্প্রতি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন মেগান বার্টেলস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেরবিজ্ঞান বিষয়ক সাংবাদিক।

অ্যালার্জি কী

মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার দুটি অংশ রয়েছে; একটি হলো নতুন কোনো জীবাণু বা উপাদানের বিরুদ্ধে তার সাধারণ প্রতিক্রিয়া। অপরটি হলো, আগেই তার শরীর মোকাবিলা করেছে এমন কোনো জীবাণু বা রোগ সৃষ্টিকারী উপাদানের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া। মায়ো ক্লিনিকের অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ মানসি কানুগা বলেছেন, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা খুব জটিল এবং একে কঠিন কাজ করতে হয়। এ ব্যবস্থাকে আমাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এমন জিনিস চিনতে সক্ষম হতে হবে আবার কখন সেই জিনিসের বিরুদ্ধে লড়াই করবে তাও জানতে হবে এবং কখন স্থির হতে হবে তাও জানতে হবে।

এটা অনেকে জানেন যে, আগের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্মৃতি বা শক্তি শরীরে মজুদ থাকে। ফলে সেই পুরনো জীবাণু আক্রমণ করতে এলে শরীর তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে অ্যালার্জি আক্রমণ করে নির্দিষ্ট রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যে পদার্থ এ ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তাকে ‘অ্যালার্জেন’ বলা হয়। অ্যালার্জি নিয়ে কাজ করা মায়া জেরাথ বলেছেন, ‘যেকোনো প্রোটিনে যে কারও অ্যালার্জি হতে পারে।’

গবেষকরা বলছেন, মানুষের শরীরে প্রাথমিকভাবে অ্যালার্জি কীভাবে বিকশিত হয় তা এখনো রহস্যাবৃত। যদিও তাদের কিছু তত্ত্ব রয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানান যে, শিশু নির্দিষ্টভাবে অ্যালার্জি সমস্যা নিয়ে জন্মায় না। এ সমস্যা জীবনের যে কোনো সময় যে কারও হতে পারে বা কেউ এ থেকে সেরে উঠতে পারে। বিভিন্ন প্রমাণ থেকে তারা এ-ও বুঝতে পারেন যে, জিনগত কারণে অ্যালার্জি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা আছে এমন মা-বাবার সন্তানরা ভুক্তভোগী হতে পারে। মানুষের শরীরে অ্যালার্জির বিস্তার কতটা হবে তা নির্ভর করে ওই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যদি মানব শরীরের ক্ষমতা বেশি হয় তাহলে ওই অ্যালার্জি তাকে আক্রমণ করা বিষয়ে সতর্ক থাকে। তবে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গের সংস্পর্শে অ্যালার্জির বিস্তারে তারতম্য ঘটে। যেমন কোনো শরীর হয়তো তার অন্ত্রে অ্যালার্জির আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। কিন্তু ত্বকে এ আক্রমণ তার জন্য নতুন। অ্যালার্জি তখন সেখানে প্রতিক্রিয়া শুরু করবে।

যেভাবে আক্রান্ত

এর পরের প্রশ্ন হলো, গাছের রেণু কেন মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে? কারণ তৃণভোজীদের বিরুদ্ধে গাছের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। গাছের কাঁটা এবং তিক্ত স্বাদ তৃণভোজীদের প্রতিরোধ করে। তবে এতে এসব প্রাণীর অ্যালার্জি সমস্যা দেখা দেয় না। অপরদিকে পরাগ নিছক একটি পদার্থ যা উদ্ভিদ বংশবিস্তারে ব্যবহার করে, যাকে উদ্ভিজ শুক্রাণু বলা হয়। ওয়েস্ট টেক্সাস এএন্ডএম ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী নবারুণ ঘোষ বলেছেন, মানুষকে আক্রমণ পরাগের উদ্দেশ্য নয়। দুর্ভাগ্যবশত মানুষের শরীর বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এ উপাদানের সঙ্গে পরিচিত নয়। কারণ, ঋতু পরিবর্তনের ফলে বাতাসে নতুন পরাগের আবির্ভাব ঘটে। এসব পরাগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যায় মানুষের জন্য। অ্যালার্জি উৎপাদক ক্ষুদ্র, বায়ুবাহিত পরাগ সহজেই নাক দিয়ে শ্বাসনালির গভীরে যেতে পারে। এসব পরাগ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়, এতে অ্যালার্জির প্রকাশ ঘটে। সাধারণ অর্থে বুঝতে গেলে, পরাগের এমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই যা অ্যালার্জি তৈরি করতে পারে, তবে মানুষের শরীর এর সংস্পর্শে এলেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যাকে অ্যালার্জি বলে।

এই উদ্ভিজ পরাগ শরীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের প্রোটিন এর সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসে। এর নাম ‘ইমিউনোগ্লোবুলিন ই’ বা ‘আইজিই’। অ্যালার্জির পেছনে কাজ করে এই প্রোটিন। যখন ইমিউন সিস্টেম অ্যালার্জেন শনাক্ত করে, তখন শরীরে প্রচুর ‘আইজিই’ তৈরি হয়। যা শরীরের প্রতিরোধক কোষের সঙ্গে আবদ্ধ হয়। এসব কোষ তখন প্রচুর রাসায়নিক মিশ্রণ নির্গত করে। যেমন হিস্টামাইন এবং অন্যান্য প্রদাহজনক পদার্থ যা হয়তো আবদ্ধ অবস্থা তৈরি করে। এসব কারণে চোখে পানি এবং হাঁচি আসতে পারে। অর্থাৎ পরাগ যদি শ্বাস নেওয়ার ফলে নাকে ঢুকে যায়, তাহলে নাকে প্রদাহ হয় বা চোখে লাগলে সেখান থেকে পানি ঝরে।

রচেস্টার মেডিকেল সেন্টার ইউনিভার্সিটির অ্যালার্জিস্ট এমিলি ওয়েইস বলেন, অ্যালার্জি হলো আপনার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যে সঠিকভাবে কাজ করছে তার প্রমাণ। এই প্রতিরোধব্যবস্থা সবসময় নিজেকে সক্রিয় রাখে এবং এটাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আরেক বিশেষজ্ঞ বলেন, আমরা সত্যি স্বীকার করি যে মৌসুমি অ্যালার্জি আমাদের জীবনযাত্রার মানের ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলে। তবে বিশেষজ্ঞ ওয়েইস এবং জেরাথ অ্যালার্জি নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি ত্রিমুখী পদ্ধতির প্রস্তাব করেন।

প্রতিকার

প্রথমত, সম্ভব হলে পরিচিত অ্যালার্জেন, অর্থাৎ যে পরাগের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি হয় তার কাছাকাছি যাওয়া এড়িয়ে চলুন। কখন বাইরে সময় কাটাতে হবে তা নির্ধারণ করুন। ঘরকে পরাগমুক্ত করতে জানালা বন্ধ রাখতে পারেন। স্থানীয় পরাগ স্তর পর্যবেক্ষণ করা নিরাপদ হবে। অর্থাৎ আপনার এলাকায় কোন ধরনের গাছ এবং ফুল বেশি তা জেনে রাখুন। উপসর্গ দেখা দিলে অ্যান্টিহিস্টামাইনস এবং অন্যান্য ওষুধ সেবন করতে পারেন।

যদি এসব পন্থা পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। এ ক্ষেত্রে অনেকে ‘অ্যালার্জি শট’ নেয়। এসব শটে কম মাত্রায় অ্যালার্জেনের মিশ্রণ থাকে যা অনেকটা করোনার টিকার মতো কাজ করে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে এ অ্যালার্জেন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। যা শরীরে অ্যালার্জি বিষয়ে প্রতিরোধ তৈরি করে। তবে এর ফলাফল পেতে সময় লাগে। অ্যালার্জি শট দিয়ে চিকিৎসার সুফল পেতে প্রায় ছয় মাস এবং সম্পূর্ণ হতে পাঁচ বছর সময় নিতে পারে।

অনেকে এ লেখা পড়ার পর ‘আইজিই’ নিয়ে বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কারণ এই উপাদান না থাকলে তাদের সর্দি, হাঁচি বা কাশি এমনকি জ্বর হতো না। ঋতু বদলাক অথবা নাকে-চোখে গাছের পরাগ ঢুকে পড়ুক; আইজিই না থাকলে যন্ত্রণা পোহাতে হতো না। কারণ তারা হয়তো এ বিষয়টা জানেন না যে, অতীতে এ আইজিই মানুষকে বিভিন্ন পরজীবীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে। আধুনিক মানুষের সেসব পরজীবীতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আর নেই। এক সময়ের ভয়ংকর রোগ থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে এ আইজিই সর্দি-হাঁচির কারণ হিসেবে এখনো টিকে আছে। বাংলাদেশে অনেক গাছের রেণু শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর বলে দেখা গেছে। এর মধ্যে কদম ফুলও রয়েছে। সাধারণত বর্ষায় ফোটে এ ফুল। যার রেণু বর্ষার বৃষ্টিকণা ও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যাদের অনিয়মিত শ্বাসকষ্ট রয়েছে, তারা এ ফুলের রেণুতে আক্রান্ত হতে পারেন। এ ছাড়া কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে আকাশমণি বা অ্যাকাশিয়া গাছের রেণুও সাধারণভাবে শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। যা নাকের মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করলে অনেকেই আক্রান্ত হন।

সাবধানতা

ফুল বা গাছের পরাগ ছাড়া ধুলা, রঙ, গন্ধ অনেকের অ্যালার্জির কারণ হয়। শহর এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব বেশি। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিচ্ছন্ন শহর, পরিবেশ ধংস, ময়লা-আবর্জনা এমন বহু কারণ শহর এলাকায় উপস্থিত থাকে যা অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। এমনকি অনেক রাসায়নিক পদার্থও শহরাঞ্চলের বাতাসে অধিক মাত্রায় ভেসে বেড়ায়। এ সবের কারণেও অ্যালার্জি হয়। অনেকের জন্য যা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশের মান উন্নয়ন করতে হবে। এসব রোগে আক্রান্তদের সহজ ও জটিল যে কোনো ধরনের চিকিৎসা সহজপ্রাপ্য করতে হবে। বর্তমানে অনেকে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছেন। যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় ধরনের যন্ত্রণাও তৈরি করছে। ফলে শহর পরিচ্ছন্ন ও বসবাসের উপযোগী রাখা জরুরি। পাশাপাশি আক্রান্তরা

যেন চিকিৎসা ও যত্ন পান সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

অনেকের সান অ্যালার্জি হয়। এই বৈশাখের প্রচন্ড রোদে বের হলে তাদের চামড়া লাল হয়ে যায়। তাদের এ সময়ে সাবধান থাকা আবশ্যক।