টেকনাফ টুডে ডেস্ক : এশিয়ার যে দেশগুলোতে বনাঞ্চলের পরিমাণ সবচেয়ে কম,বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে। বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থা আর মাত্র দুটি দেশে পাকিস্তান ও মঙ্গোলিয়া। বাংলাদেশের বনভূমি যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, তা কোনো প্রাকৃতিক কারণে হয়নি। দিনে দিনে মানুষই বন-জঙ্গল উজাড় করেছে। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা, পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টির অভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বাছবিচারহীন উন্নয়ন প্রকল্প। ইট বানাতে কৃষিজমির মাটি ধ্বংস, কাঠ পোড়াতে বিরান হচ্ছে গাছ এভাবে চলছে উন্নয়নকাজ।
এ ধরনের প্রকল্প যে এখনো চলছে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তর-এ প্রকাশিত ‘ইকো-ট্যুরিজমের নামে বন ধ্বংসের ছক’ সংবাদটি। মৌলভীবাজারে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সাফারি পার্ক গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য জায়গা হিসেবে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত পাথারিয়া পাহাড়ের দক্ষিণ অংশ এবং জুড়ি উপজেলার লাটি টিলাকে বাছাই করা হয়েছে। যে বন দুটিতে রয়েছে বন্যহাতি, মহাবিপন্ন চশমাপরা হনুমান ও উড়ন্ত কাঠবিড়ালিসহ ২০০ প্রজাতির প্রাণী। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে তৈরি করা একটি মাস্টার প্ল্যান ইতিমধ্যে বন বিভাগে জমা পড়েছে। প্রস্তাবিত সাফারি পার্কে এশিয়ান ও আফ্রিকানসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রাণী আনা হবে। এই ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প প্রমাণ দিচ্ছে যে, উন্নয়নের নামে বনভূমি উজাড় করার সংস্কৃতি থেকে আমরা এখনো সরে আসতে পারিনি।
তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ করা হবে রেস্টুরেন্ট, বহুতল ভবন, ৫০০ কর্মচারীর জন্য আবাসিক স্থাপনা ও অতিথিদের জন্য আবাসন, পার্কিং, শিশুদের জন্য পার্ক, বিদ্যুতের জন্য পাওয়ার স্টেশন, একাধিক ফটক, অভ্যন্তরীণ ১০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা এবং পার্কের ভেতর বিভিন্ন অংশ নির্ধারণ করার জন্য আলাদা আলাদা সীমানা প্রাচীর। এছাড়া একাধিক ওয়াচ টাওয়ার, ফুড জোন ও কনফারেন্স হলসহ ৪১টি শ্রেণির ভবন নির্মাণ করা হবে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যান তৈরিতে ১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৯৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিবছর সরকার ১৫ থেকে ১৮ কোটি টাকা পর্যটকদের কাছ থেকে রাজস্ব হিসেবে পাবে। এভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস করে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরে ১৫ কোটি আয়ের অর্থনৈতিক যুক্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বন্যপ্রাণী গবেষক ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, সংরক্ষিত বনে এভাবে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে বিদেশি প্রাণী আনা বন ধ্বংসের আয়োজন মাত্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প সময়ে যে পদ্ধতিতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে তাকে অবৈজ্ঞানিক বলেও মনে করছেন তারা। বন রক্ষার দায়িত্ব যে বন বিভাগের, তারা সাফারি পার্ক বা ইকো-ট্যুরিজমের নামে উল্টো বন ধ্বংস করলে তা হবে ‘রক্ষক হয়ে ভক্ষকের আচরণ’। নতুন সাফারি পার্ক না করে বন পুনরুদ্ধার করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে সেখানে বিলুপ্ত প্রাণীর পুনঃস্থাপন অনেক বেশি জরুরি। শুধু দেশি এবং বিলুপ্ত ও বর্তমানে বিরাজমান দেশীয় প্রাণী প্রজাতি দিয়ে আন্তর্জাতিকমানের কোনো সাফারি পার্ক কোনো বন ধ্বংস না করে করা হলে তা হবে সময়োপযোগী। কারণ দেশে তেমন একটি সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানার দারুণ অভাব আছে। এখানে বন সংরক্ষণের কথা বলে ইকো-ট্যুরিজমের নামে যে হাজার কোটি টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে তা সংরক্ষণ নয়, বন ধ্বংসের পরিপূর্ণ আয়োজন। দেশে যে দুটি সাফারি পার্ক আছে তা শুধু নামেই। আসলে এগুলো বৃহৎ পরিসরে উন্নতমানের চিড়িয়াখানা মাত্র। এর মূল কারণ দুটি পার্কই বিশ্ব সাফারি পার্কের কোনো মানদণ্ডে পড়ে না। দেশ-বিদেশের জীব নিয়ে দুটি একইরকম সাফারি পার্ক থাকার পরও ভিনদেশি প্রাণীর সমাহারে আরেকটি সাফারি পার্ক কেন প্রয়োজন, তা বোধগম্য নয়।
দেশে আলাদা করে একটি বন্যপ্রাণী বিভাগ সৃষ্টি না করে এবং সরকার ঘোষিত বিভিন্ন অভয়ারণ্যগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা না করে সাফারি পার্ক করার নামে বন বিভাগ নতুন নতুন সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার ও তা ব্যবহারের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে সাফারি পার্ক অনেকটা বিনোদন কেন্দ্রের মতো। প্রকৃত সাফারি পার্ক হলে সেখানে যা আছে গাছপালা বা বন্যপ্রাণী, ঠিক সেভাবেই থাকবে। বাইরে থেকে কোনো প্রাণী আনা হবে না। কোনো আবাসস্থল পরিবর্তন করা হবে না। ঠিক কেনিয়ার মাসাইমারা বা মাউন্ট কেনিয়ার মতো। কিন্তু আমাদের সাফারি পার্কে দেশ-বিদেশের প্রাণী এনে বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করে তাদের বিচরণের ব্যবস্থা করে মানুষকে বিনোদন দেওয়া হয়। সংরক্ষিত বনের ভেতর হাজার কোটি টাকার নির্মাণকাজ চালালে সেই বনের পশুপাখিদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হবে, নষ্ট হবে তার স্বাভাবিক চিত্র।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপের সঙ্গে রয়েছে উন্নয়নের আকাক্সক্ষা। বনভূমি ও পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করে উন্নয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথেষ্ট বিচার-বিবেচনার পরিচয় না দিতে পারলে ‘উন্নয়ন’ হয়তো মিলবে, কিন্তু দেশটি তখন কতটা বাসযোগ্য থাকবে, সেই প্রশ্ন দেখা দেবে।
