ইউরো নকআউট পর্ব : ফ্রান্স-পর্তুগালের পর জার্মান-সুইডেনের বিদায়

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার শেষ ষোলোর ম্যাচে ২-০ গোলে জিতেছে ইংল্যান্ড। স্টার্লিং দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন হ্যারি কেইন।

বড় মঞ্চে জার্মানি সামনে পড়লেই যেন পথ ভুলে যায় ইংল্যান্ড-অন্তত গত কয়েক দশকে মেজর টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের গল্পটা ছিল এমনই। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে জেতার পর ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনাল ও ১৯৯৬ ইউরোর সেমি-ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরেছিল ইংল্যান্ড। পরে ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে উড়ে যায় শেষ ষোলোয়।

৫৫ বছর পর অবশেষে কোনো মেজর টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে জার্মানিকে হারাতে পারল ইংল্যান্ড।

পুরো ম্যাচে বল দখলে একটু পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ড আক্রমণেও ছিল কিছুটা পিছিয়ে। তবে কার্যকারিতার দিক থেকে এগিয়ে ছিল তারাই; তাদের পাঁচ শটের চারটিই ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে জার্মানির ৯ শটের তিনটি লক্ষ্যে থাকে।

ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকে চলে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। তবে বিরতির আগে নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কেউ। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচেই জাল অক্ষত রাখা ইংল্যান্ডের রক্ষণ এদিনও ছিল জমাট। প্রথম তিন ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করা জার্মানির রক্ষণভাগের প্রথমার্ধের পারফরম্যান্সও ছিল দারুণ।

৩০তম মিনিটে ডান দিক থেকে ইয়াসুয়া কিমিখ দূরের পোস্টে দারুণ ক্রস বাড়িয়েছিলেন; কিন্তু জায়গামতো পৌঁছাতেই পারেননি রবিন গোজেন্স। দুই মিনিট পর সতীর্থের বাড়ানো বল ধরে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন টিমো ভেরনার; কিন্তু গোলরক্ষককে একা পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি সুযোগ। সময়মতো এগিয়ে গিয়ে রুখে দেন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড।

বিরতির ঠিক আগে মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের ভুলে বল পেয়ে আক্রমণে ওঠেন স্টার্লিং। ডি-বক্সের মুখে ডিফেন্ডারদের বাধায় যদিও পড়ে যান তিনি, কিন্তু বল পেয়ে যান ফাঁকায় দাঁড়ানো কেইন। তবে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি রাশিয়া বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৬ গোল করা এই স্ট্রাইকার।

দ্বিতীয়ার্ধের চতুর্থ মিনিটে দূর থেকে বুলেট গতির শটে পিকফোর্ডের পরীক্ষা নেন কাই হাভার্টজ। দারুণ দক্ষতায় কর্নারের বিনিময়ে ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক।

৭৫তম মিনিটে দারুণ গোছালো এক আক্রমণে জার্মান রক্ষণ ভেঙে দেয় ইংল্যান্ড। আক্রমণের শুরুটা হয় গোলদাতা স্টার্লিংয়ের পায়েই। তিনি কেইনকে বল বাড়িয়ে দ্রুত ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন। এর ফাঁকে কেইন ও জ্যাক গ্রিলিশ হয়ে বাঁ দিকে বল পেয়ে গোলমুখে ক্রস বাড়ান লুক শ। আর গোলমুখে সাইড-ফুট শটে বল জালে পাঠান ম্যানচেস্টার সিটি মিডফিল্ডার স্টার্লিং।

এই গোলে কিছুটা দায় আছে মাটস হুমেলসের। কেইন বল রিসিভ করার সময় তার পাশেই ছিলেন তিনি, কিন্তু চ্যালেঞ্জ জানানোর চেষ্টাই করেননি অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডার। আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার আত্মঘাতী গোলেই হেরেছিল জার্মানি।

খানিক বাদেই নায়ক থেকে খলনায়ক হতে বসেছিলেন স্টার্লিং। তার ভুলে বল পেয়ে হাভার্টজ বাড়ান সামনে মুলারকে। দ্রুত এগিয়ে যাওয়া বায়ার্ন মিউনিখ ফরোয়ার্ড গোলরক্ষককে একাও পেয়েছিলেন; কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নিয়ে হতাশ করেন মুলার।

এরপরই ৮৬তম মিনিটে ব্যবধান বাড়িয়ে জয় প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেন কেইন। বুকায়ো সাকার বদলি গ্রিলিশের দারুণ ক্রসে হেডে ঠিকানা খুঁজে নেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। জার্মান বাধা টপকে শেষ আটে ওঠার উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো ওয়েম্বলি।

ইউরোয় জার্মানির বিদায়ের সঙ্গেই দলটির সঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের পথচলা শেষ হলো বিশ্বকাপ জয়ী কোচ ইওয়াখিম লুভের। হান্স ফ্লিকের কোচিংয়ে নতুন যাত্রা শুরু করবে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

অপরদিকে লাসগোর হ্যাম্পডেন পার্কে মঙ্গলবার রাতে শেষ ষোলোর ম্যাচে ২-১ গোলে জিতেছে ইউক্রেন। অলেকসান্দার জিনচেঙ্কোর গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সুইডেনকে ম্যাচে ফেরান এমিল ফর্সবার্গ।

ইউক্রেন দলে নেই তারকা কোনো খেলোয়াড়। তবে ডাগআউটে তারকা আছেন একজন-কোচ আন্দ্রে শেভচেঙ্কো। খেলোয়াড়ী জীবনে এসি মিলানের হয়ে জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ২০০৪ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ী তিনি। তার হাত ধরেই ইউরোর পথচলায় আরেক ধাপ এগিয়ে গেল ইউক্রেন।

শুরুতে তাদের চেপে ধরেছিল সুইডেন। প্রথম ভালো সুযোগটি পায় যদিও ইউক্রেন। একাদশ মিনিটে কাছ থেকে রোমান ইয়ারেমচুকের নেওয়া নিচু শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকান গোলরক্ষক রবিন ওলসেন।

অষ্টাদশ মিনিটে সুযোগ পান ফর্সবার্গ। সতীর্থের ক্রস ডি-বক্সে লাফিয়ে ঠিকমতো হেড করতে পারেননি তিনি। পরের মিনিটে ডি-বক্সে আলেক্সান্দার ইসাকের শট লক্ষ্যে থাকেনি।

খেলার ধারার বিপরীতে ২৭তম মিনিটে এগিয়ে যায় ইউক্রেন। ডান দিক থেকে আন্দ্রে ইয়ারমোলেঙ্কোর ক্রসে প্রথম স্পর্শে বাঁ পায়ের জোরালো ভলিতে জাল খুঁজে নেন অরক্ষিত জিনচেঙ্কো​। ওলসেন বলে হাত ছোঁয়ালেও আটকাতে পারেননি।

বিরতির আগে সমতায় ফেরে সুইডেন। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ফর্সবার্গের বাঁ পায়ের বুলেট গতির শট প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে দিক পাল্টে জালে জড়ায়।

টানা তিন ম্যাচে জালের দেখা পেলেন ফর্সবার্গ। গ্রুপের শেষ রাউন্ডে পোল্যান্ডের বিপক্ষে দলের ৩-২ ব্যবধানের জয়ে করেছিলেন জোড়া গোল। আসরে তার মোট গোল হলো ৪টি।

৫৫তম মিনিটে দুর্ভাগ্যের ফেরে গোল পায়নি ইউক্রেন। আট গজ দূর থেকে সিদরচুকের শট পোস্টে লাগে। পরের মিনিটে ডি-বক্সে ঢুকে ফর্সবার্গের নেওয়া শটও পোস্টে বাধা পায়।

৬৬তম মিনিটে সুইডিশ মিডফিল্ডার দেজান কুলুসেভস্কির শট ঝাঁপিয়ে ঠেকান গোলরক্ষক। একটু পর দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে ফর্সবার্গের জোরালো শট ক্রসবারে লাগে।

নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে ভালো একটি সুযোগ পান কুলুসেভস্কি। ডি-বক্সে তার শট পা বাড়িয়ে ঠেকিয়ে দেন এক ডিফেন্ডার।

৯৯তম মিনিটে বড় ধাক্কাটা খায় সুইডেন। প্রতিপক্ষের আর্তেম বেসেদিনকে মারাত্মক ফাউল করে শুরুতে হলুদ কার্ড দেখেন মার্কাস দানিয়েলসন। পরে ভিএআরের সাহায্যে তাকে লাল কার্ড দেখান রেফারি।

ওই সুযোগ কাজে লাগায় ইউক্রেন। ১২০ মিনিটের পর তিন মিনিট যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে আসে জয়সূচক গোল। বাঁ দিক থেকে সতীর্থের ক্রসে হেডে ঠিকানা খুঁজে নেন আর্তেম। ইতিহাস গড়ার উৎসবে মাতে ইউক্রেন। শেষ আটে আগামী শনিবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে তারা।