মাইনাস নয় প্লাসের প্রজ্ঞায় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

saiful-Alam.jpg

সাইফুল আলম |
দেশে সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সারা দেশের মানুষ মেতে উঠেছেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী উৎসবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সংলাপে অংশ নিয়েছে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও আন্দোলনের অংশ বলেই জানিয়েছেন।

এককথায় বলা যায়, সবাই এখন নির্বাচনের মাঠে। এবারের নির্বাচন দেশের অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তাতে সন্দেহ নেই। সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ এবং ছবি তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। যেমন, একটি আসনে (বরগুনা-২) একই দলের ৩৪ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম কিনেছেন এবং জমাও দিয়েছেন। বলা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে দেশে বিরাজ করছে স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ, সংশয় আর আশঙ্কার অন্ত ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব আশঙ্কা অবসানের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছে আশাবাদ আর উৎসবের আমেজ। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী উত্তাপ।

আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন- এর মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা, রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব। সেখানে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া কিংবা মান-অভিমানের স্থান নেই। রাজনীতি শুধু অনুকূল স্রোতে দাঁড় বাওয়া নয়, প্রতিকূল অবস্থায়ও নাও ভাসানো এবং পাল তোলা।

১৯৯০-এ সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টিপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জেলখানায় থেকে, মারাত্মক বিরূপ পরিস্থিতির মুখে, নেতিবাচক প্রেক্ষাপটে ৫টি আসনে দাঁড়িয়ে সব ক’টিতেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার দল আসনও পেয়েছিল অনেকগুলো। সেটাও ছিল গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরনের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্র হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা এবং সমঝোতার সংস্কৃতি। সেটাই গণতন্ত্রের প্রাণ।

গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিংকনের যে সর্বজনীন সংজ্ঞা- ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসন’- সে গণতন্ত্রে কাউকে ‘মাইনাস’ করার কোনো সুযোগ নেই। সবাইকে ‘প্লাস’ করাই সেখানে প্রজ্ঞার পরিচায়ক। এ কথা আমরা বারবার বলে এসেছি যে, ‘গণতন্ত্র মাইনাস নয়, প্লাসের প্রজ্ঞা।’ যে কথাটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপের সূচনা বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন- ‘দেশটা সবার, সবাই মিলে গড়তে হবে।’

আমরা মনে করি, এ বাক্য বা উক্তিটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথা নয়, দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের কথা। একইভাবে ঐক্যফ্রন্টের নেতা দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে সমঝোতার শিল্প।’ আমরা গণমাধ্যমকর্মীরাও এই উপলব্ধিটাই সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট রয়েছি বছরের পর বছর, সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়। গণমাধ্যমকর্মীরা দেশের গণমানুষের বুকের স্পন্দনটা ঠিকভাবে অনুভব করতে পারেন বলেই হয়তো সেটা এমনভাবে তুলে ধরেছেন নিরন্তর।

২.

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিষয়। এটা ‘তৈরি’ করা অবস্থায় পেয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। এমনকি গণতন্ত্রের ধ্রুপদী সংজ্ঞাগুলোও আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখছি অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে যাচাই করে গ্রহণ করতে।

১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১- এই তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০০৬-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পরও নানা গোঁজামিলের কারণে সেটা ভেঙে পড়ে উদ্ভব ঘটে ১/১১-র অনিয়মিত সরকারের। ৯০ দিনের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সে সরকার ২ বছর ক্ষমতায় থাকে, যার কোনো শাসনতান্ত্রিক বৈধতা ছিল না। তা সত্ত্বেও শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও চলমান রাষ্ট্রকাঠামোর স্বার্থে জাতিকে তা মেনে নিতে হয়েছিল। ২০০৮-এর নির্বাচনও উৎসবমুখর হয়েছিল ছোট-বড় সব দলের অংশগ্রহণের কারণে।

২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না আসায় এক অভাবনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়- ১৫৩টি সিটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। দেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকার গঠনের জন্য যেখানে প্রয়োজন ১৫১টি আসন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই নিরঙ্কুশ জয় সম্পর্কে বলা যায়, এ হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণে আমাদের দেশের রাজনীতিকদের ব্যর্থতা আর অপরিণামদর্শিতা।

আর সেই কষ্টটাই ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে মঙ্গলবার। তার ভাষায়, ‘একটা যে দুঃখ থাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলাম, এটা কিন্তু আনন্দিত হওয়ার মতো বিষয় নয়। এটা একটা দুঃখিত হওয়ার মতো বিষয়।’ আমরা বিশ্বাস করি, অর্থমন্ত্রীর এই ‘দুঃখিত হওয়ার’ অর্থপূর্ণ স্বীকৃতি নির্বাচন বর্জনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও সঠিকভাবে উপলব্ধি করবেন। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ এটাই।

৩.

‘গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন, সংখ্যালঘুর সম্মতিতে’- এটা একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর উক্তি। অর্থাৎ প্রকৃত গণতন্ত্রে কাউকেই বর্জনের অবকাশ নেই। ওড়ার জন্য পাখির শক্ত দুটি ডানার প্রয়োজন। তার একটি দুর্বল কিংবা কৃত্রিম হলে যেমন চলে না, ঠিক তেমনই শক্তিশালী সরকার তখনই সম্ভব যখন দেশে থাকে শক্তিশালী বিরোধী দল।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে একটি দ্বিধা ছিল, সংশয় ছিল। কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেছিলেন, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির আগে দেশে যেমন রাজনীতির নামে জ্বালাও-পোড়াও পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের বিচক্ষণতা ও শুভ চৈতন্যোদয়ে সেই অশুভ আশঙ্কা দূরীভূত হয়েছে। সব দলের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দেশ মেতে উঠেছে নির্বাচনী উৎসবে।

এবারের নির্বাচন দেশের অন্যান্যবারের নির্বাচনের চেয়ে বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমী হবে বলে আমাদের ধারণা। কারণ নানা শ্রেণীর, নানা পেশার মানুষ এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের দৌড়ে শামিল হয়েছেন। রাজনীতিকদের ‘মনোপলি’তে চির ধরানোর প্রয়াসও তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে তরুণদের অংশগ্রহণের আকাক্সক্ষাও ব্যক্ত হচ্ছে। ছাত্রনেতা, খেলোয়াড়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পী, কলাকুশলী, তরুণ ব্যবসায়ী সর্বোপরি নারীরাও মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তারা সংরক্ষিত আসন নয়, রীতিমতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হবেন, এ বিশ্বাসে।

দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দেখা দেবে এ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আয়নায় ফুটে উঠেছে আগামী দিনের ইতিবাচক বাংলাদেশের সুস্পষ্ট চিত্র। গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখার পথে আরও একধাপ অগ্রসর হল দেশ। ’৮৬ সালে আওয়ামী লীগ, ’৯১ সালে জাতীয় পার্টি এবং ২০১৮ সালে বিএনপি গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম সংলাপের দ্বার উন্মোচন করে গণতন্ত্রের পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এতে গণতন্ত্রেরই জয় হল। কাউকে মাইনাস নয়, সবাইকে প্লাস করেই এগিয়ে যাবে গণতন্ত্র, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ- আজকের ঘনায়মান ঘটনা প্রবাহে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top