রোহিঙ্গা শিবিরে প্রত্যাবাসন বিরোধী চক্র সক্রিয় : বৃহস্পতিবারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত

001713Rohingya_kalerkantho_pic.jpg

‘ক্রিস্টিয়ান এইড’ নামের এনজিও প্রকাশ্যে চালাচ্ছে অপতৎপরতা

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় রয়েছে দেশি-বিদেশি কয়েকটি চক্র। এসব চক্রের লোকজন দেশি-বিদেশি নানা এনজিও’র ছদ্মাবরণে উস্কানি দিয়ে আসছে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের দেশে না ফিরতে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা এরকম বেশ কয়েকটি এনজিও প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের কৌশলে অনাগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে। তন্মধ্যে ‘ক্রিস্টিয়ান এইড’ নামের একটি এনজিও একদম প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণও মিলেছে।

এসব কারণেই শেষ মুহূর্তে বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এক প্রকার অনিশ্চিত হয়ে গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী দেশি-বিদেশি নানা মহলের তোড়জোড়ের মুখে শেষ সময়ে সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ায় এলাকাবাসী হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবুও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার এখন সরকারের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক মহলের কাছে বিবেচনাধীন রয়েছে।

অথচ বৃহস্পতিবার মিয়ানমার-বাংলাদেশের ঘুংধুম প্রত্যাবাসন কেন্দ্র হয়ে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরার যাবতীয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত ছিল প্রথম দফায় ৩০ পরিবারের দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে যাবে।

এদিকে প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য গত কয়েক দিনের অব্যাহত কঠোর পরিশ্রমের পর বুধবার রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এক প্রকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে তার মানে এ নয়-দীর্ঘদিনের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। আমরা এখন থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে শিবিরে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরাতে মোটিভেশনের কাজ করব।’

সরেজমিনে বুধবার উখিয়া উপজেলার পালংখালী জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ক্রিস্টিয়ান এইড নামের একটি বিদেশি সংস্থার বেশ কিছু কর্মী কয়েকজন রোহিঙ্গাকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পের অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ওই এনজিও কর্মীদের কথা বলার সময় কালের কণ্ঠ পত্রিকার প্রতিবেদককে সামনে দেখে রেগে চটে যান তারা। তারা প্রতিবেদকের কাছে জানতে চান, পরিচয়পত্র আছে কিনা, ক্যাম্পে ঢুকতে অনুমতি নিয়েছেন কিনা?

ক্যাম্পে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীকে পরিচয় নিশ্চিত করে ক্যাম্পে প্রবেশ করা হয়েছে জানালেও ক্রিস্টিয়ান এইড নামক বিদেশি এনজিও’র ওই কর্মীরা বলেন, এখানে ঢুকতে হলে সেনাবাহিনী নয়, ক্রিস্টিয়ান এইডের (সিএইড) প্রধান কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। নয়তো ক্যাম্পে কোনো সাংবাদিক কাজ করতে পারবে না। এ ছাড়া তারা এ প্রতিবেদককে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করেন। এমনকি এক প্রকার হুমকিও প্রদান করেন এসব এনজিও নামধারী কর্মীরা।

পরে বিষয়টি ক্রিস্টিয়ান এইডের স্থানীয় কার্যালয়ে তাওহিদুল নামে এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি নিয়ে যান সিনিয়র আরেক কর্তার কাছে। ক্রিস্টিয়ান এইডের জামতলী ক্যাম্পস্থ ওই সিনিয়র কর্তাব্যক্তিও বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পে প্রবেশ করতে হয়। তবে ক্রিস্টিয়ান এইড এই ক্যাম্পের সাইট ম্যানেজম্যান্টের কাজ করে বিধায় অভ্যন্তরীণভাবে যে কেউ এখানে কাজ করতে বা প্রবেশ করতে হলে তা আমাদের জানাতে হয়, এটাই নিয়ম।

এনজিও কর্মকর্তা পরিচয়ধারী ব্যক্তি এক প্রকার হুংকার দিয়ে বলেন, আমাদের না জানিয়ে কেউ এখানে কাজ করার সুযোগ পাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘আপনি তো দেশি পত্রিকায় কাজ করেন, আমরা অনেক বিদেশি বড় মিডিয়াকেও এখানে সহজে ঢুকতে দিই না।’

একজন এনজিও কর্মকর্তার এ রকম ‘ডেয়ারিং এবং ডেসপারেজ’ ভাব দেখে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক রোহিঙ্গা শিবির কাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে? রোহিঙ্গা শিবিরে সাহায্য-সহযোগিতার আড়ালে থেকে দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছুই না মেনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী কার্যকলাপে কিভাবে জড়িত হয় তারা? এ বিষয়ে গতরাতে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন- ‘এরকম কর্মকাণ্ড অত্যন্ত অপত্তিকর এবং দুঃখজনক তাই বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখব।’

নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা জানান, ‘ক্যাম্পে এক-এক এনজিও’র লোকজন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা শুনায়। কোনো কোনো এনজিও’র লোকেরা রোহিঙ্গা নেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। তাদের বুদ্ধিতে রোহিঙ্গারা মূলত বিপথগামী হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা ভোগতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করা।’

শিবিরগুলোতে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রত্যাবাসন বিরোধী এনজিওগুলোর উস্কানিতে শিবিরে প্রত্যাবাসন বিরোধী সন্ত্রাসী রোহিঙ্গার সংখ্যাও বাড়ছে। পরিস্থিতি সেখানে এমন করেই তৈরি করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের কেউ দেশে ফিরে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করলেই তাদের হত্যা করা হয়। এরকম অবস্থায় গত এক বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রত্যাবাসন বিরোধী সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের হাতে কমপক্ষে ৩২ জন রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে।

এমনকি দেশে ফিরে যাবার আগ্রহ দেখালেই প্রত্রাবাসন বিরোধীরা তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে আর খোঁজ মিলেনা অপহৃত রোহিঙ্গার। এসব কারণে জানের ভয়ে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গারাও মানের বিরুদ্ধেই বলে যায়- দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে তিনি দেশে ফিরে যাবেন না।

প্রসঙ্গত, গেল বছর ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুলিশ চৌকিতে হামলাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী দমনের নামে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন শুরু করে মিয়ানমার বাহিনী। তারা রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করে। মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ আশ্রয় নেয় প্রায় সোয়া সাত লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে এগার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ী অঞ্চলে ৩০টি শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

সূত্র কালের কন্ঠ অনলাইন

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top