ঐক্যফ্রন্ট নেতারা মনে করেন : সংসদ ভেঙে নির্বাচন ও সরকার গঠনে সংবিধানেই সমাধান

image-165509-1541444304.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :: আগামী জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান সংবিধানের ১২৩ (৩) খ উপদফায় এবং ৫৬ (২) অনুচ্ছেদে আছে বলে মনে করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের দাবি, সংসদ ভেঙে কীভাবে নির্বাচন হবে, তা ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের ‘খ’ উপদফায় বলা আছে। ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমস্যার নিষ্পত্তি সম্ভব।

দুই দিন ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ মতিঝিলের চেম্বারের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা একমত হন, সংবিধানের মধ্যে থেকে সংকটের সমাধান আছে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের (খ) উপদফায় সংসদ ভেঙে নির্বাচনের বিধান রয়েছে। এতে উল্লেখ রয়েছে ‘মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’

এ ক্ষেত্রে বিএনপিপন্থি আইনজীবী ও দলের আইনজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে দলের বাইরের কয়েকজন খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। এ উপদফা নিয়ে বিএনপির ব্যাখ্যা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন সম্ভব।

সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদের প্রতি ১০ জনে টেকনোক্র্যাট একজন কোটায় অনির্বাচিত ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা যাবে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ বর্তমান মন্ত্রিপরিষদে ৫৩ জন সদস্য রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করতে পারবেন। ৫৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন।’

বিএনপি নেতাদের দাবি, নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। অর্থাৎ গত পাঁচ বছর যারা সরকার পরিচালনা করছেন, তারা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি নেতাদের মত, যেহেতু বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন’, কাজেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানসহ অন্যদেরও রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

এ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন, প্রতিরক্ষাসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করে যুক্তফ্রন্ট। জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তৎকালীন সরকার ওই সময়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য স্বরাষ্ট্র ও সংস্থাপনসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল; কিন্তু বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, গণভবনে ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছোট পরিসরে সংবিধানের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেখছি। আমরা আশা করছি, এর মধ্য থেকে সমাধান বের করতে পারব।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে তারা সমাধান বের করতে চান। অনেক বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহার, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া এবং নির্বাচন কমিশন আলোচনার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা এই চার ইস্যুতে তারা অনড় থাকবেন। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ একমত হলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে যাওয়ার আলোচনা আছে তাদের মধ্যে।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি নেতারা বলছেন, এবারের সংলাপ সীমিত পরিসরে এবং তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। ঐক্যফ্রন্ট তাদের দাবিগুলোর সাংবিধানিক ও আইনগত যৌক্তিকতা তুলে ধরবে। সিদ্ধান্তের ভার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই ছেড়ে দেবেন।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এক সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, সংসদ ভেঙে দিলে বর্তমান সরকারই অন্তর্বর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করবে। ক্ষমতাসীনরা বলতে পারে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আদালতের। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা হলে কখনই আদালত বাধা হয়নি। আদালত জামিন দিলে রাষ্ট্রপক্ষ যদি খালেদা জিয়ার জামিনের বিরোধিতা না করে বা আপিলে সাজা স্থগিতের বিরোধিতা না করে, তা হলে ভোটের সময় খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব এবং তার ভোটে অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়।

এদিকে আগামীকাল গণভবনে দ্বিতীয় দফা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ হবে। এ কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বড় কোনো কর্মসূচি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা মনে করছেন, এখনই বড় কোনো কর্মসূচি দিলে সরকার সংলাপ ভেঙে দেওয়ার মতো কারণ সামনে দাঁড় করাতে পারে। এই অবস্থায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জনসভা করার মধ্য দিয়ে বড় ধরনের শোডাউন করাই তাদের টার্গেট।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, সরকার নেতাকর্মীদের আসতে বাধা বা গ্রেপ্তার না করলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঙ্গলবার যে জনসভা হবে, সেটা স্মরণকালের সেরা। এত বড় জনসভা হবে, যা আগে কোনো দল বা জোট করতে পারেনি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে আমাদের ন্যায্য দাবি আদায় করাই আমাদের টার্গেট।

প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানান, আজ দুপুর ২টায় এ জনসভা শুরু হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বক্তব্য রাখবেন। এতে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জানা গেছে, জনসভায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের জামায়াত বাদে অন্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশের একাংশ এই জনসভায় অংশগ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন এই দলের মহাসচিব অ্যাডভোকেট বাদল।

গতকাল সকালে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ডিএমপি কার্যালয়ে যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ বলেন, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছে।

জনসভা সফল করতে কয়েক দফা বৈঠক করেছে ঐক্যফ্রন্ট। ইতোমধ্যে যৌথসভা করে নেতাকর্মীদের নানা দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ঢাকা, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ পাশর্^বর্তী জেলার সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদেরও বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাদের পুলিশি হয়রানি এড়িয়ে এসব জেলা থেকে সকাল থেকে এবং কোনো ক্ষেত্রে রাতেই ঢাকায় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের সর্বাধিক উপস্থিতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।

নির্বাচন ইস্যুতে কাল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক নির্বাচন ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতাদের মতামত নেবে বিএনপি। আগামীকাল বুধবার সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে নির্বাহী কমিটির নেতাদের মতামত নেবে দলটির স্থায়ী কমিটি। প্রথমে নির্বাহী কমিটির সদস্যদের বাদ দিয়ে শুধু যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক এবং সহসম্পাদকদের সঙ্গে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই বৈঠক হবে। এর পর বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মতামত নেওয়া হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী আমাদের সময়কে জানান, এ বৈঠক আগামীকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অথবা জোরালো আন্দোলন বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে উপস্থিত নেতাদের সবার মনোভাব পজেটিভ থাকলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নানা মতামত আসে।

নির্বাচন ইস্যুতে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা বলেন, দ্রুতই তফসিল ঘোষণা করা হবে। ফলে নির্বাচন বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সুরে কথা বলেন আরও দুই নেতা। তাদের এই বক্তব্য শেষ হলে স্থায়ী কমিটির আরেক নেতা বলেন, গুম হয় তৃণমূল, নির্যাতনের শিকার হয় তৃণমূল; অতএব তাদের মতামত নেওয়া উচিত। তাদের মতামত ছাড়া নির্বাচনে গেলে আমরাও রেহাই পাব না। কারণ বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়ে এখনো তৃণমূলের আবেগ আছে। এর পর স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে নির্বাহী কমিটির নেতাদের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে টেলিফোনে কেন্দ্রীয় নেতাদের জানানো হয়। গতকাল সোমবার এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের মৃত্যুতে এক দিনের শোক ঘোষণায় তা পিছিয়ে ৭ নভেম্বর বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top