সিপাহী বিপ্লবঃ জিয়ার কূটকৌশলে পর্যুদস্ত হয়েছিলেন কর্নেল তাহের

-বিপ্লব.jpg

নিউজ ডেস্ক: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। সকাল থেকেই ঢাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিলো। বেতার-টেলিভিশনে কোন কিছুই প্রচার করা হচ্ছিল না। বোঝা যাচ্ছিল না দেশে কোন কার্যকর সরকার আছে কি না। ৪ নভেম্বর। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের যৌথ মিছিল বের হয়ে ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যায়। মিছিলে খালেদ মোশাররফের মা ও ছোট ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ছিলেন। চারিদিকে রটে যায় আওয়ামী লীগপন্থীরা খালেদের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।

বিবিসি ও রয়টার্সের ঢাকা প্রতিনিধি আতিকুল আলম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি তাজউদ্দীনের কথিত একটি চিঠি নিয়ে ৪ ও ৫ নভেম্বর কূটনীতিক পাড়ায় ছোটাছুটি করেন। তিনি দাবি করেন, ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে উদ্দেশ্য করে লেখা ওই চিঠিতে অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

৬ই নভেম্বর মধ্যরাতে ‘সিপাহী বিপ্লব’ সংঘটিত হলো। লে. কর্নেল রশিদের দুই ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের একটি দল মেজর মহিউদ্দিন ও সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে রাত ১২টায় সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হবার সাথে সাথে জিয়ার বাসায় যায় জিয়াকে মুক্ত করতে। জিয়া মুক্ত হয়ে দুই ফিল্ড আর্টিলারিতে আসার কিছুক্ষণ পরেই লে. কর্নেল (অব) আবু তাহের সেখানে হাজির হন।

সিপাহী বিপ্লবের অনুঘটক ছিলেন আবু তাহের। গৃহবন্দি অবস্থায় তাহেরের সঙ্গে জিয়া টেলিফোনে যোগাযোগ রাখছিলেন। তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ভিত্তিতেই তাহেরের লোকেরা ৬ই নভেম্বর মধ্যরাতে বিদ্রোহ শুরু করেন, জিয়া মুক্ত হন।

রাত ২টা ৩০ মিনিটের দিকে তাহের আসেন জিয়ার কাছে। তখন জিয়াকে ঘিরে ছিলেন লে. কর্নেল আমিনুল হক, মেজর মহিউদ্দিন, মেজর যুবায়ের সিদ্দিকী, মেজর মোস্তফা, মেজর মুনির ও সুবেদার মেজর আনিস। তাহের জিয়াকে সেনানিবাস থেকে বের করে ঢাকা বেতারকেন্দ্রে নিয়ে যেতে চাইলেন। বেতার কেন্দ্র তখন তাহেরের অনুগত লোকেদের দখলে। জিয়া সেনানিবাস থেকে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

ভোরে ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে তাহেরের লোকেরা ‘সিপাহী বিপ্লব’ এর ঘোষনা দেয়। ঘোষণায় বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সৈনিকরা এবং বিপ্লবী গণ-বাহিনী বিপ্লব করেছে, এবারের বিপ্লব সিপাহী বিপ্লব, জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে ইত্যাদি। রহস্যজনকভাবে জাসদ কিংবা রব–জলিল–তাহেরের নাম বলা হলো না। জনমনে ধারণা তৈরি হলো- জিয়াই নায়ক।

সকাল ১০টায় ঢাকা সেনানিবাসে সভায় উপস্থিত জিয়া, ওসমানী, খলিল, তাওয়াব, এম এইচ খান, মাহাবুবুল আলম চাষী ও আবু তাহের। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ওসমানী খন্দকার মোস্তাকের নাম প্রস্তাব করলেন। জেনারেল খলিল ও কর্নেল তাহের আপত্তি জানালেন। বিচারপতি সায়েমকেই রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখা হলো।

৭ই নভেম্বর সন্ধ্যায় যখন বিচারপতি সায়েম বেতারে ভাষণ দেন, তখন জিয়াউর রহমান ও আবু তাহের দু’জনেই বেতারকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। তাহের জিয়াকে বলেন, বিপ্লবী সৈনিকদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে, জিয়া তা যেন শোনেন এবং মেনে নেন। জিয়া স্বভাবসূলভ ধীর-স্থীরভাবে জানান, তিনি একটুপর সৈনিকদের সাথে দেখা করবেন। বেতারের ষ্টুডিওতে আসার আগেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ রেকর্ড করা হয়েছিলো, যাতে তাহের বা জাসদের সশস্ত্র সৈনিকরা কোন শর্ত বা দাবি-দাওয়া নিয়ে চাপ দিতে না পারে। জিয়ার এই কৌশল ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হবার পর, জিয়া খুব হালকা মেজাজে তাহেরকে নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন। জিয়া ঘরে ঢুকেই সৈনিকদের সঙ্গে হাত মেলালেন, কুশল জিজ্ঞাসা করলেন এবং ছোট একটা টেবিলের উপর বসে খোশমেজাজে তাদের সাথে আলাপ জুড়ে দিলেন। তিনি সৈনিকদের মধ্যে একজনকে দাবি-দাওয়া পড়ে শোনাতে বললেন। পড়া শেষ হতেই জিয়া বললেন, দাবিগুলো খুবই ন্যায্য এবং তা অবশ্যই পূরণ করা হবে। দাবিগুলোর মধ্যে একটা ছিল জলিল–রবের মুক্তি। জিয়া সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুক্তির নির্দেশ দিলেন। এতে জাসদপন্থী সৈনিকদের মধ্যে যেটুকু উত্তেজনা অবশিষ্ট ছিলো, তা-ও মুহূর্তে মিলিয়ে গেলো। বাকি দাবিগুলো যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করা হবে- এই আশ্বাস দিয়ে জিয়া অত্যন্ত আস্থার সাথে সৈনিকদের সাথে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে গেলেন। মেজর জুবায়ের সিদ্দিকী দেখলেনঃ

‘জেনারেল জিয়ার এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন কৌশলের কাছে কর্নেল আবু তাহের একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে হতাশ ও অত্যন্ত নিরাশ হয়ে পড়লেন। আরো একটি সিগারেট ধরিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালে জমে ওঠা ফোটা ফোটা ঘাম মুছতে মুছতে পাশেই রাখা ক্রাচের মতো লাঠিটি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে জাসদপন্থীদের সিপাহী বিপ্লবের ফলাফলকে নিজেদের পক্ষে নেবার শেষ আশাটুকুও যেন কর্পূরের মতো উবে গেলো। টু-ফিল্ডের সৈনিকরা দেখতে লাগলো যতক্ষণ পর্যন্ত না লাঠিতে ভর দিয়ে কর্নেল তাহের তাদের দৃষ্টি সীমানা ছাড়িয়ে গেলেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top