সেন্টমার্টিন রক্ষায় আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে

saintmartin-blue-marine.jpg

আলম শাইন |
সেন্টমার্টিনকে বলা হয় চিরশান্তির দ্বীপ! বিষয়টি অবিশ্বাস্য ঠেকতে পারে অনেকের কাছেই। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, দেশের একমাত্র শান্তিপ্রিয় মানুষ হচ্ছেন সেন্টমার্টিনবাসী। কারণ সেন্টমার্টিন দ্বীপে অদ্যাবধি খুনখারাবির মতো বড় ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। এ অঞ্চলের মানুষ অশিক্ষিত হলেও ভদ্রতা বা নম্রতায় প্রশংসার দাবি রাখেন। এর বিভিন্ন কারণ আছে অবশ্য; তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে, স্বল্প জনবসতি এবং রক্ষণশীল অধিবাসী।

দ্বীপের অধিবাসীর সংখ্যা খুব বেশি নয়; আগের শুমারি মোতাবেক প্রায় হাজার ছয়েক। শিক্ষিতের হার শূন্যের কোঠায়। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীই মৎস্যজীবী। তারা নিরীহ, দরিদ্র ও শান্তিপ্রিয় মানুষ। কোনো ধরনের রাহাজানি বা হানাহানির সঙ্গে জড়িত নয়। সারাদিন মৎস্য আহরণেই ব্যতিব্যস্ত থাকে তারা। তাছাড়া রক্ষণশীল হওয়ার সুবাদে বাইরের মানুষ সেখানে গিয়ে অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড করার সুযোগ পায় না খুব একটা। এ ব্যাপারে সেন্টমার্টিনবাসী বেশ সোচ্চার।

তবে কিছু পর্যটক রাত যাপনের নামে অহেতুক বাড়াবাড়ি করছেন এটা সত্য। যেমন, উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে কিংবা বারবিকিউর আয়োজন করে জীববৈচিত্র্যকে হুমকির সম্মুখীন করছেন। উল্লেখ্য, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন হাজার বিশেক পর্যটক যাতায়াত করেন। তাদের কিছু অংশ রাতযাপনকালে বিভিন্ন ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন। এতে জীববৈচিত্র্য প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়ছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হলে সেন্টমার্টিন রক্ষায় গঠিত হয় আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি। সেই কমিটি সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিনেরবেলায় দ্বীপটিতে ঘুরে বেড়াতে পারবে পর্যটকরা; কিন্তু রাতযাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা আগামী বছরের ১ মার্চ থেকে কার্যকর হবে। এ ছাড়া ছেঁড়াদ্বীপ ও গলাচিপা এলাকা পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে। এটিকে একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত আমরা বলতে পারি, যদিও এ সিদ্ধান্তটি নেওয়া উচিত ছিল দশ-পনের বছর আগে। তাহলে হয়তো সেন্টমার্টিনে এত অট্টালিকা গড়ে ওঠার সুযোগ হতো না। দেরিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ নয়। তবুও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। কারণ এ সিদ্ধান্ত একসময় সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আমাদের ধারণা।

আমরা জানি, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দ্বীপটির অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে। আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র সাড়ে ৮ বর্গকিলোমিটার। জোয়ারের সময় আয়তন খানকিটা হ্রাস পেয়ে ৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। দ্বীপটির নামকরণ হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে। জনৈক ইংরেজ মি. মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপের নামকরণ হয়। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এ ছাড়া এখানে রয়েছে প্রকৃতির অজস্র সম্পদ, যার সঠিক ব্যবহার হলে জাতীয় জীবনে আমরা বিশেষভাবে উপকৃত হতাম।

এক সমীক্ষায় জানা যায় এ দ্বীপে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ২০০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৫ প্রজাতির দুর্লভ কাছিম, ১৫ প্রজাতির সাপ, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১২০ প্রজাতির পাখি (দেশি ও পরিযায়ী মিলিয়ে), ৫ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৫ প্রজাতির টিকটিকি-গিরগিটি, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল রয়েছে। রয়েছে পাথুরে শিলা ও হরেকরকম শৈবালের রাজ্য। এ ছাড়া অসংখ্য নারিকেলগাছ ও কেয়াবনসহ নানা ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। এসব কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের দুর্লভতম স্থানগুলোর একটি। বিশেষ করে এত স্বল্প আয়তনের আর কোনো স্থানে এমন নৈসর্গিক দৃশ্য ও বহুল প্রজাতির উদ্ভিদ বা জীব প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায় না।

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইদানীং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ আর্কষণীয় হয়ে উঠছে। জানা যায়, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সেখানে প্রায় দেড় লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ ইতিবাচক দিক। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। দ্বিমতটা হচ্ছে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে গিয়ে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে। দ্বীপ ভ্রমণে গেলে যে জিনিসটি সর্বাগ্রে নজর কাড়ে তা হচ্ছে, বিলাসবহুল হোটেল-মোটেলসহ বেশকিছু পাকা-সেমিপাকা দালান, যা ছিল না বিগত এক যুগ আগেও। এসব গড়তে গিয়েই সেন্টমার্টিনের মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়েছে। ফলে ভরা বর্ষায় দ্বীপ ভাঙনের কবলে পড়ে। এতে করে সংকুচিত হচ্ছে দ্বীপ। এ ছাড়াও পর্যটকদের সুবিধার্থে রাতের আঁধারকে দূর করতে জেনারেটরের ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে হোটেল ব্যবসায়ীদের। ফলে রাতে দ্বীপে আশ্রয় নেয়া অনেক প্রজাতির প্রাণী বা মাছ ভয়ে সটকে পড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বের দুর্লভ প্রজাতির ‘অলিভ রিডলে টার্টল’ (জলপাইরঙা কাছিম) ভয়ে ডিম পাড়া থেকে বিরত থাকছে। পেটে ডিম নিয়ে কাছিমগুলো পরপর তিন রাত দ্বীপে উঠে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় ওরা অন্যত্র চলে যায়। সেখানে গিয়েও ওরা রেহাই পায় না, পেটের ভেতর ডিম ফেটে মারা যায়। এভাবে জলপাইরঙা কাছিম বিলুপ্তির পথ ধরেছে।

ফাইল ছবি


অপরদিকে গোদের ওপর বিষফোড়া হচ্ছে, বহুতল ভবন গড়ার হিড়িক। বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসব ভবনের ওজন বহন করার সামর্থ্য ছোট্ট এ দ্বীপটির নেই। ফলে এটি যে কোনো সময়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে পারে। জানা গেছে, এটি একটি ভাসমান দ্বীপ। সুদূর মালয়েশিয়ার একটি দ্বীপের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, চামচাকৃতির একটি প্রবাল প্রাচীরের সঙ্গে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সংযোগ রয়েছে। সমুদ্রের গভীর তলদেশ দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে এ সংযোগ স্থাপন হয়েছে। উল্লেখ্য, এ সংযোগ বাঁটটি প্রবালের জীবাশ্ম দিয়েই তৈরি। কাজেই অধিক ওজন বহনের ক্ষমতা নেই এটির। অধিক ভার বহনের কারণে যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে বাঁটটি। আর সে ধরনের কিছু ঘটে গেলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই বিষয়টি মাথায় এনে এখানে বহুতল ভবন তৈরির বিপক্ষেও অবস্থান নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে অবৈধ পাথর উত্তোলনেরও। দেখা গেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেলেই মাটি খুঁড়ে বড় বড় পাথর উত্তোলন করে বহুতল ভবনের কারুকার্যে ব্যবহার করছেন। ফলে দ্বীপটি তার পরিবেশগত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে দ্রুত। শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, পর্যটকরাও ছোট ছোট নুড়ি, শিলাপাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে লুকিয়ে-চুকিয়ে নিয়ে আসছেন, যা তদারকি করার কেউ নেই বললেই চলে। এ ছাড়াও পর্যটক দ্বারা পরিবেশের বহুবিধ ক্ষতি সাধন হচ্ছে। যেমন- পলিথিন, বিহারের কৌটা, কোমলপানীয় ও প্লাস্টিকের পানির বোতলসহ নানা ধরনের জিনিস ফেলে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করা হচ্ছে। অবস্থান নেয়া পর্যটকরা রাতে বারবিকিউর আয়োজন করে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে দ্বীপে আশ্রয় নেয়া প্রাণীকূলকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। এতে করে দ্বীপ প্রাণীশূন্য হয়ে যাচ্ছে।

তাই আমাদের প্রত্যশা, কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে। পর্যটকদের আগমনকে নিরুৎসাহিত না করে বরং সুন্দর সহনীয় নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। তাহলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ টিকে থাকবে শত-হাজার বছর। রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্যও।

আলম শাইন : বন্যপ্রাণীবিষয়ক লেখক

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top