বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের বিস্তার, দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্য

ALBNPFlag-1.jpg

নিউজ ডেস্ক: সচেতনভাবে বাংলাদেশের মতো উদার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটানোর অপচেষ্টা বহুদিন ধরে চালিয়ে আসছিলো একটি রাষ্ট্রবিরোধী চক্র। বিএনপি মার্শাল অর্ডিন্যান্স দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগ অনেক পুরনো। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসলে দেশে জঙ্গিবাদের প্রেতাত্মা চেপে বসে। তৎকালীন সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় জেএমবি নামক ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর পর পরই হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) ও হিজবুত তাওহীদসহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনের রক্তাক্ত উত্থান দেখতে পায় দেশবাসী। ইসলাম রক্ষা ও ইসলাম প্রচারের নামে মূলত স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ তথা আওয়ামী লীগসহ অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা শুরু করে জঙ্গি সংগঠনগুলো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান এবং দেশে-বিদেশে তাদের নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সালের শেষ পর্যন্ত জঙ্গিবাদের ভয়াবহ রূপ বাংলাদেশ দেখেছে। মূলত, মূলধারার রাজনীতির নামে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। তৎকালীন বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমানে লন্ডনে পলাতক তারেক রহমান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। তৎকালীন বিএনপির উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতাই জঙ্গি গোষ্ঠীর ‘গডফাদার’ হিসেবে কাজ করেছিলেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ঘটে। এতে নিহত হয় ২৩ জন, আহত হয় পাঁচ শতাধিক। এ হামলায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একটি বৃহৎ অংশ, বিশেষ করে বিএনপির শক্তিশালী তরুণ নেতৃত্ব ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জড়িত সেটি ইতোমধ্যে মামলার রায়ে প্রমাণ হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী পিন্টুসহ একাধিক বিএনপি নেতা বিভৎস এই হামলার সাথে জড়িত ছিলেন। এই হামলায় আওয়ামী লীগ প্রধান তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও মারা যান মহিলা আওয়ামী লীগ প্রধান আইভি রহমান। ২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি সিলেটের হযরত শাহজালাল দরগাহ শরীফে এক বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয় এবং আহত হয় ১৩৮ জন। এছাড়া ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে তখনকার ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে চালানো বোমা হামলায় হাইকমিশনার বেঁচে গেলেও ঘটনাস্থলে মারা যায় দু’জন, আহত হয় ২০ জন। অন্যদিকে, ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ শহরে দানিয়ার এক মেলাতে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ৮ জনকে।

২০০২ সালের ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের সিনেমা হলগুলিতে সিরিয়াল বোমা হামলা চালানো হয়। নিহত হয় ১৮ জন, আহত হয়েছিল ৩০০ জন। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিলে রমনা পার্কের বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত ও একশ’রও বেশি আহত হয়। ২০০১ সালের শেষের দিকে, ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বরে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সভায় জঙ্গিদের বোমা হামলায় ৮ এবং ৪ জন মারা যান। আহতের সংখ্যা শতাধিক। ২০০৫ সালে হবিগঞ্জের বৈধর বাজারে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা হামলায় মারা যান সাবেক অর্থমন্ত্রী গোলাম কিবরিয়াসহ পাঁচ জন। আহত হয় ১৫০ জন।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে প্রতিটি জেলায় বোমা হামলা চালানো হয়। জঙ্গিরা তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা কেমন তা দেশবাসীকে জানান দেয় এভাবেই। ২০০৫ সালের নভেম্বরের ১৪ তারিখে ঝালকাঠিতে দু’জন সহকারি জেলা জজকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বরে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলে একসঙ্গে বোমা হামলা করা হয়। এ হামলায় নিহতের সংখ্যা ৯, আহতের সংখ্যা ৭৮। ২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ের সামনে এক বোমা হামলায় নিহত হয় ৮ জন, আহত ৪৮ জন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৩ সালে জেএমবি, হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশকে (হুজি-বি) ও ইসলামিক বিপ্লবী পরিষদকে (আইডিপি) নিষিদ্ধ করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের ভেতরের জঙ্গিবাদের সমর্থক অংশের বাধার কারণে সরকার তা করতে ব্যর্থ হয়, বরং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হয়। সরাসরি হাওয়া ভবন থেকে তারেক রহমানের নির্দেশে দেশব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে জঙ্গিরা প্রগতিশীল মানুষদের হত্যা করার মিশনে নেমে পড়ে। বিএনপির নেতারা শুধু জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ই দেননি বরং আটক জঙ্গিদের মুক্ত করতে তদবিরও করেছেন। খোদ তারেক রহমান জঙ্গিদের মুক্ত করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে তারেক রহমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে মার্কিন দূতাবাস গোপন বার্তায় তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা না দিতেও অনুরোধ জানায়।

এদিকে বাংলাদেশকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মুক্ত করতে এরইমধ্যে উল্লেখযোগ্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে দেশ দ্রুত এ উগ্রবাদী ছোবল থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ ‘রোল মডেল’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও উগ্রবাদী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর সাঁড়াশি অভিযানে সাধারণ জনগণের মনেও ধীরে ধীরে স্বস্তির ভাব ফিরে এসেছে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতেও সরকার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। জনগণের মধ্যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত সন্ত্রাসবিরোধী বার্তা এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ছোট নাটিকা প্রচার করা হচ্ছে। দেশের সব মসজিদে নিয়মিতভাবে বিশেষ করে পবিত্র জু’মার নামাজের আগে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এছাড়া সারা দেশের মাঠ প্রশাসনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।

জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনই শুধু নয়, প্রতিটি জেলার দলীয় নেতা, সুশীল সমাজ ও সমাজের প্রভাবশালী মানুষদের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগের কারণেই দেশের সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-মানববন্ধনের মাধ্যমে নিজেদের ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট গঠন করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু সফল অভিযান পরিচালনার ফলে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিনেতাসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেফতার ও নিহত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলা-বারুদ উদ্ধার হয়েছে। হলি আর্টিজান হামলার পর এযাবৎ কালে যতগুলো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে তার সবগুলো থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী আঘাত হানার পূর্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং জঙ্গি আস্তানাসমূহ গুড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ প্রো-অ্যাক্টিভ পুলিশিং এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অভিযানসমূহ পরিচালনার ফলে বর্তমানে জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং জঙ্গি দমনে এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top