নদীর বিলুপ্তি ডেকে আনবে বিপর্যয়

image-35794-1523089043.jpg

হুসাইন রবিউল|
নদীমাতৃক বাংলাদেশে আমাদের জীবন, জীবিকা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য সবকিছুই গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। নদী বাংলাদেশকে করেছে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা।

নদীর সংস্পর্শে প্রাকৃতিক সম্পদে আমাদের দেশ হয়েছে প্রাচুর্যময়। নদীর ইতিবাচক প্রভাব এদেশকে যেমন করেছে সমৃদ্ধ, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব দেশকে ঠেলে দিচ্ছে মহাসংকটে।

তথ্যমতে, বাংলাদেশে একসময় হাজারের বেশি নদী থাকলেও বর্তমানে তা শতকের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, বিগত পঞ্চাশ বছরে আমাদের দেশে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বিলুপ্তির পথে রয়েছে আরও হাজার হাজার কিলোমিটার নদীপথ। আশঙ্কাজনক হারে নদীর এ বিলুপ্তি আগামীতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে নদী বিলুপ্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

উত্তরাঞ্চলে প্রায় একশ’ নদী বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে। এ নদীগুলো বিলিন হওয়া মানে সেখানে মরুময়তা সৃষ্টি হওয়া।

প্রাকৃতিক কারণে আমাদের দেশের নদীগুলো বর্ষাকালে প্রবল প্রতাপে উত্তাল হয়ে ওঠে, শীতকালে সেই নদীর ভিন্ন রূপ দেখা যায়। জীর্ণশীর্ণ মৃত নদীর রূপ ফুটে ওঠে শীতকালে।

প্রাকৃতিক কারণে নদী উত্তাল হয় আবার প্রাকৃতিক কারণেই মৃত হয়। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা নিজেরাই যদি নদীকে গলাটিপে হত্যা করি সেক্ষেত্রে এটা আত্মঘাতী কাজ ছাড়া আর কী হতে পারে?

নদী দখল, নদী শাসন, নদী দূষণ, নদী ভরাটসহ নানাবিধ মনুষ্যসৃষ্ট কারণে আমাদের নদীগুলোর এখন ত্রাহি অবস্থা। দেশের মানুষের জীবিকার একটা বৃহৎ অংশ নদীর ওপর নির্ভরশীল।

নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আমাদের অনেকাংশে নদীর ওপর নির্ভর করতে হয়। নদীর বিপুল মৎস্য সম্পদ আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আমাদের অর্থনীতির অন্যতম সহায়ক।

নদীর বয়ে আনা পলি ও জল এদেশকে করেছে শস্য শ্যামল।

নদী দূষণের কারণে ইতিমধ্যে এদেশ থেকে অসংখ্য প্রজাতির মাছ বিলীন হয়ে গেছে। নাব্য সংকট নদীর গতি পথ বদলে দিচ্ছে। এতকিছুর পরও পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষ এখন জীবিকার জন্য নদীর ওপরই নির্ভর করছে।

কিন্তু নদীই যদি না থাকে তাহলে এ বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাদের পেশা পরিবর্তন করে নতুন পেশায় নিয়োজিত হতে হবে। তাছাড়া নষ্ট হবে আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলাফল হিসেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনিবার্য।

অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন, নদী ভরাট করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং নদী দূষণের মাধ্যমে নদীর যে পরিবর্তন ঘটছে তার প্রভাব কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে।

কৃষি, জলবায়ু, ঋতু, জীববৈচিত্র্য, নৌযোগাযোগ এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় দেখা দিচ্ছে অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে হচ্ছেন শহরমুখী। নিজেদের পেশা বদলে নতুন পেশার খোঁজে ছুটছেন নদীনির্ভর মানুষগুলো।

একসময় যারা নদীতে মাছ ধরতেন, মাঝিমাল্লার কাজ করতেন, নদী তীরের কৃষি জমিতে চাষবাস করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা সবাই এখন জীবন-জীবিকার তাগিদে ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন।

এর মূল কারণ নদী ভরাট, নদী দূষণ ও নদী পাড়ের ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা স্থাপন।

নদীর নানাবিধ সংকট আমাদেরকে প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দৈন্য করে তুলছে। হারিয়ে যাচ্ছে শস্য শ্যামল বাংলার প্রাকৃতিক রূপ।

নদীর ওপর মানবসৃষ্ট অত্যাচার বন্ধ না হলে এর জন্য ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে সবাইকে।

হুসাইন রবিউল : গণমাধ্যমকর্মী

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top