জাতীয় পার্টিতে অস্বস্থি বাড়ছে

News_1.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে (জাপা) অস্বস্তি তত বাড়ছে। এমনিতেই গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারে এবং বিরোধী দলে অবস্থান নিয়ে দেশের প্রেক্ষাপটে নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছে। সে সঙ্গে নানা সময়ে স্ববিরোধী কথাবার্তা বলে পার্টিকে ‘হাস্যকর’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে দলের সব পর্যায়ে।
অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, জাতীয় পার্টির বক্তব্য এখন আর কেউ আমলে নিতে চায় না। সংসদে নিজেদের দ্বৈত অবস্থান এবং দলীয় নেতাদের বিভিন্ন সময়ে স্ববিরোধী বক্তব্যের কারণে নিজেরাই নিজেদের গুরুত্ব হারিয়েছেন। এসব করে গণমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই রসাত্মক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
অনেকে বলছেন, সরকারি দলের কোনো সমালোচনা করার সময় দলটির নেতাকর্মীদের ‘সেলফ সেন্সরশিপে’র মুখোমুখি হতে হয়। কখনো কখনো সংসদে থাকা দলটির নেতাদের বক্তব্যের ভাষা শুনে মনে হয়, সরকারি দলের করুণায় আজ তারা সংসদে বসতে পেরেছেন। কারণ, মন্ত্রী থাকার কারণে সরকারের কড়া সমালোচনা করাও সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে।
জাতীয় সংসদের দুটি আসনে আগামীকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপনির্বাচন। এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের আশঙ্কা করছে জাতীয় পার্টি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদাকে এ ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি। গাইবান্ধা-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের দুই সংসদ সদস্য মারা যাওয়ায় এ উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা শুনেছি, সুন্দরগঞ্জের বাইরের লোক নির্বাচনী এলাকায় ঢুকেছে। তারা কেন্দ্র দখল করবে। এর আগের নির্বাচনগুলোতেও তারা এভাবে কেন্দ্র দখল করে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। এ নির্বাচনেও তারা সেটা করতে পারে। সিইসিকে আমরা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছি। এ দুটি নির্বাচনের ওপর নির্ভর করবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে।
কারা কেন্দ্র দখল করবে তা স্পষ্ট না করলেও জাতীয় পার্টির মহাসচিবের বক্তব্যে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় তিনি কাদের ইঙ্গিত করে কথা বলেছেন। চার বছর ধরে নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও সরকারি দলকে বাঁচিয়ে কথা বলতে হচ্ছে জাপা নেতাদের। এভাবেই একটা চাপা অস্বস্তি বয়ে বেড়াচ্ছেন দলটির ঊর্ধ্বতন নেতারা। সেই অস্বস্তি এখন ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও।
উপনির্বাচনে কেন্দ্র দখল করতে যে ‘বাইরের লোক’কে সন্দেহ করছেন জাপা মহাসচিব সে ব্যাপারে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, ব্যাপারটা তো পরিষ্কার ওই নির্বাচনী এলাকার বাইরের যারা তাদেরই বোঝানো হয়েছে ‘বাইরের লোক’। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেহেতু আওয়ামী লীগ তাই ইঙ্গিতটা তাদের দিকেই কি না, এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, তা তো বটেই।
এদিকে দলটির ভেতরে বিদ্যমান অস্বস্তি মাঝে মাঝেই প্রকাশ্যে চলে আসে। দলের চেয়ারম্যান এরশাদ বিভিন্ন সময় সরকার থেকে তার দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগের কথা বললেও বাস্তবে তা ঘটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আরও পরিষ্কার করে বলা যায়, দলীয়প্রধানের কথা শুনছেন না মন্ত্রিত্বে থাকা দলের নেতারা। এমন পরিস্থিতিতে দলের তৃণমূল পর্যায়েও বেড়েই চলেছে অস্বস্তি।
সর্বশেষ এসব বিষয়ে সংসদে হতাশা ব্যক্ত করেছেন বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদও। গত ২৭ ফেব্রæয়ারি সংসদে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন, সরকার থেকে তার দলের মন্ত্রীদের বাদ দিতে, নইলে সবাইকে সরকারে নিয়ে নিতে। তিনি বলেন, এভাবে তাদের নিয়ে টানাটানি তার ভালো লাগছে না। হয় সরকারি, নয় বিরোধী দল হওয়া দরকার ছিল তাদের। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, আমরা সরকারি, না বিরোধী দল? বিদেশে গেলে বলতে পারি না আমরা কী। প্রধানমন্ত্রীর করুণা ভিক্ষা চেয়ে রওশন বলেছেন, আপনি যদি বলতে পারতেন, মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। আমরা বলতে পারি না। এটা আপনি করলে জাতীয় পার্টি বেঁচে যেত। সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারত। আমরা সম্মানের সঙ্গে নেই। এক বছর আছে আরও, বিষয়টা দেখেন।
উল্লেখ্য, সংসদে জাতীয় পার্টির এমপি রয়েছেন ৪০ জন। তাদের মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী তিনজন। দলের চেয়ারম্যান আছেন মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।
এসব ব্যাপারে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় খোলা কাগজকে বলেন, একই সঙ্গে সরকারি দল এবং বিরোধী দলে থাকার ব্যাপারটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তা নয়। বিশ্বের অনেক দেশের পার্লামেন্টেই এমন নজির আছে। দলের অস্বস্তির বিষয়টি অস্বকীর করে তিনি বলেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, সেটা আমরা আগেও বলেছি।
মন্ত্রিসভা থেকে আপনাদের দলের নেতাদের পদত্যাগের বিষয়টি কতদূর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তেই হবে। এবং সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে প্রেসিডিয়াম মিটিংয়েই।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top