১৬ কোটি মানুষের জন্য দেশীয় ডিজিটাল ডিভাইস তৈরি করব : মোস্তাফা জব্বার

image-2706-1515039942.jpg

অনলাইন ডেস্ক |
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মোস্তাফা জব্বার সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাকে মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট হিসেবে নেয়া হয়েছে। বুধবার দফতর বণ্টনে মোস্তাফা জব্বারকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। এতদিন মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিল। এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে সরিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দায়িত্ব পালন করছেন জুনাইদ আহমেদ পলক। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যকে শপথ পড়ান। মোস্তাফা জব্বারসহ চারজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান শেষ করেই তিনি চলে আসেন চারবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিসি) অফিসে। সেখানে মন্ত্রী হওয়ার অনুভূতি এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।

নতুন মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কী?

এটা নিঃসন্দেহে একটি গৌরবের বিষয়। কারণ ৩০ বছর ধরে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি বলে আজ ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে। এজন্য আমি একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছি। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগান জাতির সামনে উপস্থপন করেছিলেন। আমরা এখন শিল্প যুগের চতুর্থ স্তরে বসবাস করছি। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে শিল্প কলকারখানা ছিল না। যা ছিল তা অবাঙালিদের হাতে ছিল। যার কারণে বঙ্গবন্ধু সেগুলো জাতীয়করণ করেন। ৪৬ বছর পর আজকের বাংলাদেশে আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিজেরা উৎপাদন করতে পারি। কিন্তু এটা তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শেষ স্তর। এখন যেখানে যাওয়ার সময় সেটা হচ্ছে ডিজিটাল শিল্পবিল্পব। এখন যদি সঠিকভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে না পারি, তাহলে আমার পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সৌভাগ্য ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সেই শিল্পবিপ্লবের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা অবকাঠামো তৈরি করা, অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং শিল্প খাতকে সহায়তা করার ব্যাপারে সরকারের সহায়তা পেয়ে আসছি।

ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য এখন পর্যন্ত সরকার কোনগুলোকে সাফল্য মনে করে?

বিশেষ করে ২০১৭ সালে সরকারের দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা বলতে পারি। একটি হচ্ছে, রফতানির জন্য ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা এবং অন্যটি হচ্ছে, যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে করের হার শতকারা একভাগে নিয়ে আসা। যন্ত্রাংশের শুল্কহার কমিয়ে দেয়ার কারণে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য তৈরির জায়গায় পৌঁছে গেছি। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের জন্য যদি দেশীয় ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন করতে পারি তা হলে একদিকে আমদানির বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে নিজেদের দেশের নেটওয়ার্ক তৈরির ক্ষেত্রটি শক্তিশালী করতে পারব।

তথ্যপ্রযুক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতদূর এগোল?

রফতানির জায়গায় আমরা একসঙ্গে সফটওয়্যার, সার্ভিস ও হার্ডওয়্যার রফতানির ক্ষেত্রে নগদ সহয়তার জায়গা তৈরি করতে পেরেছি। ফলে সরকার ও বেসিস মিলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি তা আমি নিশ্চিতভাবেই করতে পারব।

মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পেছনের গল্প কী?

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি বেসিসের সভাপতি হিসেবে ১৮ মিনিটের একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেখানে আমি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে তিনি যদি সেই সহযোগিতা করেন তা হলে আমরা ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারব। তিনি কিন্তু সেদিনই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই ৫ বিলিয়ন করতে হলে আমাকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই বাড়তি দায়িত্ব পালন করার জন্য তিনি যে আমাকে আজকে মন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করিয়েছেন এর জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রকৃতপক্ষে আমি ব্যক্তি মোস্তাফা জব্বারকে প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমি আমাদের দেশের তথ্যপ্রযুক্তির খাত পুরোটার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি মোস্তাফা জব্বার মন্ত্রী হয়নি; এ দেশের আইসিটি খাত মন্ত্রী হয়েছে। আমার জন্য যে জায়গাটি সহজ মনে হবে সেটা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে একটি সরকার যখন ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে যায়, তখন যদি তাকে যথাযথভাবে পরিচালনা করা না যায় তা হলে কিন্তু পুরো সরকার ডিজিটাল হওয়াটা কঠিন হয়ে যাবে। আমার দায়িত্ব হবে, আমাকে যেখানে যেই দায়িত্বই দেয়া হোক না কেন, আমি চেষ্টা করব আমাদের সরকারকে ডিজিটাল রূপান্তর এবং ডিজিটাল শিল্প খাতে যেন বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিতে পারে, সে জায়গাটা প্রস্তুত করা।

সরকারের হাতে এক বছরেরও কম সময় আছে। এই স্বল্প সময়ে আপনি কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবেন?

যদিও নির্বাচনের এক বছর বাকি আছে। কিন্তু আমরা তো ৯ বছর কাজ করেছি। এই সময়ের মধ্যে যে ভিত্তি তৈরি করার কথা ছিল সেটি হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমাদের গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। একটি হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বটা ঠিক মতো উপস্থাপন করা। বিশেষ করে সফটওয়্যার ও সেবা খাতের দিকে গুরুত্ব দিতে চাই। আমাদের সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্ব পায় না। আমাদের চেষ্টা হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সরকারের কাজ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজ করতে না পারে।

ইন্টারনেট নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

ডিজিটাল শিল্পবিপ্লবের বাহক হচ্ছে ইন্টারনেট। আমি তৃণমূল থেকে দেখে আসছি, আমার ইন্টারনেটের মূল্য, ইন্টারনেটের গতি এবং ইন্টারনেটের সেবার ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করে। ইন্টারনেট যেন জনগণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়, সেদিকে আমি চেষ্টা করব।

একসময় ইন্টারনেটের দাম কমানোর জন্য আন্দোলন করেছেন। এখন আপনি নিজেই নীতিনির্ধারক। সেক্ষেত্রে কবে ইন্টারনেটের মূল্য কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেবেন?

বাস্তবিক অর্থে আমি এ মুহূর্তে এখনও কোনো দফতরের দায়িত্বের মধ্যে থাকিনি। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী কাল নাগাদ কোনো একটা দায়িত্ব দেবেন। এবং সেই দায়িত্ব যেটাই দেন না কেন ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আমার অবস্থাও হবে তাই। যে দায়িত্বই আমি পাই না কেন, আমার কিছু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার বিষয় আছে সেগুলো আমি করব। যদি সরাসরি এই দায়িত্বের মধ্যে থাকি তা হলে সরাসরি কাজগুলো করব আর সরাসরি না থাকলে পরোক্ষভাবে কাজ করব। আমি মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রযুক্তিবান্ধব এবং অর্থমন্ত্রীও প্রযুক্তিবান্ধব মানুষ। আমাদের পুরো মন্ত্রিসভায় এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।

তবে মন্ত্রী হওয়ার পর বিশেষ কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিতে চান কিনা?

অভ্যন্তরীণ বাজার, ইন্টারনেট, পুরো সরকারকে ডিজিটাল করা এবং শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ডিজিটাল না করতে পারলে আমাদের দেশে বর্তমানে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল যুগের বাসিন্দা করতে পারব না।

প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার নিয়ে আগামী দিনে কী ইচ্ছা আছে?

আমার মন্ত্রণালয়ে কোনো ইংরেজি চিঠি আসতে পারবে না। সে তা যাই পাঠাক না কেন। দ্বিভাষা ব্যবহার করা যাবে তবে বাংলা বাদ দিয়ে নয়। আমার মন্ত্রণালয় থেকে এটা শুরু করব এরপর দেখা যাক। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ থাকলে পুরো দেশেই এটা কার্যকর করা যাবে।

– এম মিজানুর রহমান সোহেল

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top