হারবার ব্রিজের সৌন্দর্য

australia-4.jpg

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আসলে পর্যটকেরা দুটো জিনিস না দেখে ফেরেন না। তার মধ্যে এক নম্বরে আছে পৃথিবীখ্যাত সিডনি অপেরা হাউস। আর দুই নম্বরে আছে সিডনি হারবার ব্রিজ।
এই দুটোর অবস্থানও একই জায়গায় হওয়াতে এক টিকিটে দুই ছবি দেখার মতো এক ভ্রমণেই দুটো বিখ্যাত জিনিস দেখা হয়ে যায়। অবশ্য অবস্থানগত দিক দিয়ে একেবারেই সিডনির প্রাণকেন্দ্রে বলে সহজেই দেখতে যাওয়া যায়।
আপনি সিডনিতে যেখানেই অবস্থান করেন না কেনো, ট্রেনে করে সার্কুলার কিয়ে স্টেশনে নামলেই এ দুটোর দেখা পেয়ে যাবেন। এমনকি সার্কুলার কিয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সেলফি তুললে ব্যাকগ্রাউন্ডে একই সাথে এ দুটো জিনিসকে আনতে পারবেন।
সিডনিতে বসবাস শুরু করার পর বিভিন্ন কারণে অপেরা হাউস বা হারবার ব্রিজ দেখার সময় করে উঠতে পারছিলাম না। অবশেষে বছর খানেকের মাথায় একদিন আমরা বাপ-বেটি দেখে এলাম অপেরা হাউস। আর একই সাথে একটু দূর থেকে দেখে নিলাম হারবার ব্রিজকে।
কাছে গিয়ে দেখার একটা ইচ্ছে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। উপরন্তু দেখলাম, হারবার ব্রিজের উপরে অনেক মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হলো, যদি আমিও ওদের মতো হারবার ব্রিজ জয় করতে পারতাম, তাহলে সিডনিতে আসার একটা সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেত।
পরবর্তীতে গুগলের সাহায্যে খুঁজে বের করলাম ‘ব্রিজ ক্লাইম্ব’-এর ওয়েবসাইট। সেখানে হারবার ব্রিজে ওঠার বিস্তারিত দেওয়া আছে। মোটামুটি দুই প্রকারের ক্লাইম্ব আছে ওদের- ক্লাইম্বের ধরন অনুসারে আর ক্লাইম্বের সময় অনুসারে।
ক্লাইম্বের ধরন অনুসারে বিভাগের আওতায় আবার তিন রকমের ক্লাইম্ব রয়েছে- ডেইলি ক্লাইম্ব, স্পেশাল ইভেন্ট ক্লাইম্ব আর সেলিব্রেশন ক্লাইম্ব। আর ক্লাইম্বের সময় অনুসারে বিভাগের আওতায় রয়েছে- স্যামপ্লার ক্লাইম্ব, ডে ক্লাইম্ব, টুইলাইট ক্লাইম্ব, নাইট ক্লাইম্ব ও ডয়ন ক্লাইম্ব। এখান থেকে আপনি আপনার পছন্দসই ক্লাইম্বটি পছন্দ করতে পারেন ও সে অনুযায়ী অনলাইনেই টিকিট কিনতে পারেন।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। শিশুরাও (৮-১৫ বছর বয়স পর্যন্ত) ক্লাইম্বে অংশ নিতে পারবে, তবে তাদেরকে কমপক্ষে আট বছর বয়সের হতে হবে এবং সাথে অবশ্যই একজন বয়স্ক মানুষকে থাকতে হবে।
আমি দেখে-শুনে একটা ডে ক্লাইম্ব পছন্দ করে টিকিট কেটে ফেললাম। আর আপনি যদি ক্লাইম্বের ছবি তুলতে চান, তাহলে আপনাকে আরও বাড়তি কিছু ডলার খরচ করতে হবে। কারণ, ক্লাইম্বের সময় আপনি ব্রিজ ক্লাইম্বের নির্দিষ্ট পোশাক ছাড়া অন্যকিছু বহন করতে পারবেন না।
তারপর নির্দিষ্ট দিনে ব্রিজ ক্লাইম্ব অফিসে পৌঁছে গেলাম ক্লাইম্বের নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই। সেখানে গিয়ে আপনার টিকিট দেখালেই তারা আপনাকে ভেতরে যাওয়ার জন্য একটা জায়গায় বসতে দিবে। এখানে উল্লেখ্য, এক একটা গ্রুপে মোট চৌদ্দজন করে ক্লাইম্ব করতে পারে এবং তাদের জন্য একজন করে ক্লাইম্ব অ্যাসিসট্যান্ট থাকেন, যিনি ক্লাইম্বের নেতৃত্ব দেন।
আমার গ্রুপে দেখলাম, আমিই শুধুমাত্র সিডনির অধিবাসি। বাকিরা সবাই বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। দু’জন প্রৌঢ় এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার অন্য একটি জায়গা থেকে। একজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক এসেছেন ইংল্যান্ড থেকে আর একজোড়া যুবক-যুবতি এসেছেন ইতালি থেকে।
ক্লাইম্বের শুরুতেই ট্রায়াল দিতে হয়। ট্রায়াল রুমে গিয়ে নিজের পরনের সকল কাপড় বদলে ওদের দেওয়া কাপড় পরে নিতে হয়। সেই সাথে আরও অনেক দরকারি জিনিস বুঝিয়ে দেঅয়া হয় এবং সেটা কীভাবে শরীরের কোন অংশে লাগিয়ে রাখতে হবে, সেটাও হাতেকলমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
ব্রিজ ক্লাইম্বের পোশাকের সাথে নভোচারীদের পোশাকের অনেকটা মিল রয়েছে। শুধু মাথার হেলমেটটি থাকে না। তার পরিবর্তে থাকে ব্রিজ ক্লাইম্বের লোগো সম্বলিত ক্যাপ। পোশাক পরিধান শেষে একটা জায়গায় সবাইকে ট্রায়াল দেওয়া হয়, কীভাবে ক্লাইম্বের সময় উঠতে হবে, কীভাবে ঘুরতে হবে। সেখানে ব্রিজের আদলে সিঁড়ি তৈরি করা আছে।
আমাদের ক্লাইম্বের দিনটা ছিল ২০১৭ সালের সবচেয়ে উষ্ণ দিন। তাই আমাদের গ্রুপ থেকে দু’জন পৌঢ়কে বাদ দিয়ে অন্য কোনো গ্রুপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো অথবা অন্য কোনো সময়ের ক্লাইম্বে তাদেরকে সাজেস্ট করা হয়েছিলো।
অবশেষে আমরা চারজন ও আমাদের গাইড মিলে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। এগিয়ে যেতে যেতে গাইড আমাদেরকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে যাচ্ছিলো আমাদের কানে লাগানো হেডফোনে। আমাদের প্রত্যেকের সাথে ট্রায়ালের সময় একটি করে রেডিও সেট দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। যেটা দিয়ে আমরা পরস্পর যোগাযোগ করতে পারবো।
উঠতে উঠতে যাতে কেউ ক্লান্ত না হয়ে যায়, সেজন্য একটু পর পর রয়েছে থামার জায়গা। সেখানকার ট্যাপ থেকে আপনি পানি খেতে পারবেন বা মুখে পানির ঝাপটা দিতে পারবেন। আর প্রতিটা ল্যান্ডিং স্টেশনেই রয়েছে একাধিক প্রাথমিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। যাতে অভিযাত্রীদের যেকোনো সমস্যা হলে তারা সাহায্য করতে পারেন।
সেদিনের তাপমাত্রা অনেক থাকাতে আমাদের ভয় হচ্ছিলো আমরা আমাদের অভিযান শেষ করতে পারবো কিনা। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত ব্রিজের একেবারে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। ইতোমধ্যে আমাদের বেশকিছু ছবি তোলা হলো পেছনে অপেরা হাউস ও সিডনি শহরকে রেখে। ব্রিজের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে বিশাল অপেরা হাউসকে আমার হাতের আঙুলের সমান মনে হচ্ছিলো আর শহরকে দেখাচ্ছিলো আমাদের নিচে।
তবে আমার কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য লাগছিলো, ব্রিজের উপর থেকে দেখা দিগন্ত বিস্তৃত সীমারেখা। গাইড বলে যাচ্ছিলো, আমরা এখান থেকে কতদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। পরে একেবারে চূড়ায় উঠে প্রত্যেকের জন্য কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও করা হলো।
আমি এখানে আসার আগে একটা কাগজে লিখে এনেছিলাম ‘আই লাভ ইউ তাহিয়া অ্যান্ড রায়ান’। কিন্তু ওদের নিয়মে নেই, তাই আমি আর কাগজটা আনতে পারি নাই। ইচ্ছে ছিলো, ওই কাগজটা উঁচু করে ধরে একটা ছবি তুলবো, যেহেতু আমি ওদেরকে এখানে আনতে পারি নাই, তাই একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। তবে আমার ভিডিওতে আমি চিৎকার করে সে কথাগুলো বলতে পেরেছিলাম। তারপর একসময় আমরা আবার নামা শুরু করলাম।
সব মিলিয়ে মোট চার ঘণ্টা ব্যয় হয় হারবার ব্রিজ জয় করতে। সিডনিতে আগত পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই হারবার ব্রিজে ওঠা। দূর থেকে ব্রিজে ওঠাটাকে যতো কঠিন মনে হয়, বাস্তবে তা বেশ সহজ। ব্রিজের স্লোপটা খুবই কম, যাতে উঠতে তেমন কোনো কষ্ট করতে হয় না। শুধু উপরে ওঠার সময় কিছু সিঁড়ি পাড়ি দিতে সামান্য কষ্ট করতে হয়।
প্রতিদিন শত শত পর্যটক হারবার ব্রিজে উঠে এক অনন্য অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করছেন। তাই আপনিও যদি এই অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাহলে সিডনিতে এসে ব্রিজ ক্লাইম্বের এই অভিজ্ঞতার ভাগিদার হতে পারেন।
আর ব্রিজ ক্লাইম্ব শেষে ওরা আপনাকে একটা সুভ্যেনিয়র ক্যাপ ও সার্টিফিকেট দিবে, যেটা সারাজীবনের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে পারেন। যদিও আমার কাছে ওদের ফিসটা একটু বেশিই মনে হয়েছে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী
মেইল: yaqub_buet@yahoo.com

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top