চার দিনে মাত্র ১২শ’ নিবন্ধন, রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় নেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ

Ukhiya-Pic-14-09-2017-1.jpg

মুহাম্মদ হানিফ আজাদ, উখিয়া (কক্সবাজার) :
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সরকার নির্ধারিত জায়গায় নেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় প্রশাসন এ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। টেকনাফ শাহ পরীর দ্বীপ থেকে উখিয়া কুতুপালং পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে থাকা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে সরকার নির্ধারিত জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন। গত সোমবার (১১ সেপ্টেম্বর) বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন শুরুর পর দিনে কুতুপালংয়ে মাত্র ১২০০ রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছেন। লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিবন্ধন করতে কতদিন লাগবে, তা নির্দিষ্ট করে এখনই বলতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে,সেখানে চারটি বুথে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কাজ চলছে। আঙ্গুলের ছাপ, ছবি তোলা ও তথ্য সংরক্ষণ করতে একেকজন রোহিঙ্গার জন্য গড়ে তিন থেকে চার মিনিট সময় লাগছে। অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আবার ধীর গতির কারণে সরে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে নিবন্ধনের বিষয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। নিবন্ধন সম্পর্কে সাধারণ রোহিঙ্গাদের তেমন কোনও ধারণাই নাই। নিবন্ধন শুরু হয়েছে,কোথায় হচ্ছে -তা কিছুই জানেন না তারা। কুতুপালংয়ে আশ্রয় নেওয়া মো. সেলিম হোসেন নামে এক রোহিঙ্গা নিবন্ধন করতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন সবাই করতে এসেছেন, তাই আমিও এসেছি। রেশন-টাকা পাওয়া যাবে।’ সেলিমের মতো অনেকেরই ধারণা, নিবন্ধন করলে রেশন পাওয়া যাবে। তাই তারা এখানে নিবন্ধন করছেন। আবার অনেক রোহিঙ্গার ধারণা, নিবন্ধন করলে এই দেশে হয়তো তাদের থাকতে দেওয়া হবে না, তাই তারা অনেকেই নিবন্ধন করতে চাচ্ছেন না। হাজেরা খাতুন নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘নিবন্ধনের বিষয়ে এখনও আমরা ভাবিনি। খাবো কী, সেই চিন্তায় বাঁচি না।’ কুতুপালং ক্যাম্পে প্রবেশের মুখেই কথা হয় আব্দুল খালেক নামে এক রোহিঙ্গার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখনও নিবন্ধন করিনি। করবো। সবাই করলে আমিও করবো।’নিবন্ধন সম্পর্কে তার ধারণা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাজে লাগবে। তাই করতেছে।’ নিবন্ধনের চেয়ে রোহিঙ্গারা এখন খাবারের দিকে বেশি ছুটছেন। তারা সারাদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কোনও ত্রাণবাহী গাড়ী আসলেই তারা সেই গাড়ির দিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। ত্রাণ নেওয়ার প্রতিযোগিতায় থাকে নারী-পুরুষ,বৃদ্ধ- শিশু সবাই। বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজ তদারকি করছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসেনর সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একেএম লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে বায়োমেট্রিক একটি জায়গাতেই করছি। কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে করা হচ্ছে শুধু। এর কারণ হচ্ছে, অন্যান্য ক্যাম্পগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ নেই। কোনও ঘর নেই। এখানে কম্পিউটারগুলোতে যে বিদ্যুতের সংযোগ দেবো, সেই ব্যবস্থাও নেই। এসবের ব্যবস্থা করতে আমাদের আরও ৭/৮ দিন সময় লাগবে। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকে নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে কাজ শুরু হবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের চারটি বুথে কাজ হচ্ছে। মঙ্গলবার আমরা চারটি বুথ থেকে দেড়শ’ নিবন্ধন করেছি। প্রধানমন্ত্রী আসায় ওইভাবে কাজ করা যায়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার আমরা বিকাল তিনটা পর্যন্ত সাড়ে ছয়শ’ নিবন্ধন করতে সক্ষম হয়েছি। গত তিন দিনে ১২ শ’ রোহিঙ্গার নিবন্ধন করা হয়েছে।’ অন্যান্য ক্যাম্পগুলোতে কবে নাগাদ কাজ শুরু করতে পারবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। সেই সাপোর্টটা হোক, তারপর আমরা অন্য ক্যাম্পগুলোতে করবো। প্রথম দিন ডিভাইসগুলো টেস্ট করেছি। ওইদিন মাত্র ১০ জনকে নিবন্ধন করা হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘এটা হিউজ একটা কাজ। আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনার। সরকার যে দু’হাজার একর জায়গা দিয়েছে, আমরা সবাইকে সেখানে নিয়ে আসবো। একই সঙ্গে নিবন্ধন চলবে এবং তাদের নির্দিষ্ট একই জায়গায় নিয়ে আসা হবে।’ এদিকে বৃহস্পতিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) থেকে টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হবে। তবে যে সফরটওয়্যারে নিবন্ধন করা হচ্ছে, সেটাতে সামান্য ত্রুটি থাকায় সফটওয়্যারটি আপডেট করার কথা জানিয়েছেন অপারেটররা। প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর চৌকিতে হামলার হওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই অভিযানে অন্তত তিন হাজার রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় মারা গেছেন আরও শতাধিক। এই অভিযানকে জাতি নিশ্চিহ্ন করার সামিল বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ। ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আশ্রয় দেওয়ার জন্য সরকার ইতোমধ্যে দুই হাজার একর জমি কথা ঘোষণা দিয়েছে। টেকনাফ ও উখিয়াতে এই জায়গা দেওয়া হবে। তবে একই জায়গায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় প্রশাসনও মনে করছে, এটা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যারা এখানে এসে বাস্তবে বিষয়টি না দেখছেন, তারা কেউ বিশ্বাস করবেন না, আসলে এই কাজটা কত চ্যালেঞ্জের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় রোহিঙ্গা ছড়িয়ে আছে। তাদের বিষয়ে এই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে এবিষয়ে নির্দেশ দেওয়া উচিত। যাতে নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে কোনও রোহিঙ্গা থাকতে না পারেন। সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে তাদের নিবন্ধন কার্যক্রমও পরিচালনা করতে হবে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top