রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসছে আজ

FB_IMG_1504541896085.jpg

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে * বিদেশি কূটনীতিকদের আজ কক্সবাজার নেয়া হচ্ছে * রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে এসেছেন জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার কর্মকর্তা

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আজ বুধবার জরুরি বৈঠকে বসছে। মানবিক সংকট বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের উদ্যোগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধন চলছে বলার পর নিরাপত্তা পরিষদের এ জরুরি বৈঠক হতে যাচ্ছে। একই ইস্যুতে গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পৌনে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গার পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে গ্রামে যা ঘটছে তা জাতিগত নির্মূল অভিযানের একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য সুইডেন ও যুক্তরাজ্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে বলে খবর দিয়েছে রয়টার্স।

গত ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ বলেছে, এ সময়ে মিয়ানমার থেকে তিন লাখ ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের ঢাকায় ব্রিফ করার পর আজ বুধবার কক্সবাজারে সরেজমিন রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এদিকে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সহকারী কমিশনার জর্জ ওকথ-ওবো বাংলাদেশ সফরে এসেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার উখিয়া শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, মিয়ানমার এ সংকটের সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারকেই তার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সোমবার মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বানসংবলিত একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। তবে মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্র মঙ্গলবার বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যাইদ বিন রাআদ আল হুসাইন সোমবার জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলে দেয়া বক্তব্যে মিয়ানমারে নৃশংস সেনা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় আধা সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, সেখানে নিয়মিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এমনকি পলাতক বেসামরিক মানুষের গুলি করা হচ্ছে- এমন অনেক তথ্য ও স্যাটেলাইটের ছবি আমাদের কাছে রয়েছে। মিয়ানমার সরকারকে এ অভিযান বন্ধের পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহি করার আহ্বান জানান হাইকমিশনার। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই সুদূরপ্রসারী বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা যেভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নাগরিকদের রক্ষা করছে না। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে, বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনের শাসন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইউনিসেফ বলেছে, দুই লাখ রোহিঙ্গা শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেভ দ্য চিল্ড্রেনের পরিচালক জর্জ গ্রাহাম বলেছেন, মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ বিষয়টি অনুধাবন করে সহায়তায় এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা পরিবারের শিশুদের দুর্ভোগ চরমে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন শুরু করেছেন।

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তাব গ্রহণে বাধার মুখে পড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমন প্রস্তাবে বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া ভেটো দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন আবারও বলেছে তারা শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মিয়ানমার সরকারের পাশে আছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অনেক দেশের ভূমিকাও দ্ব্যর্থহীন নয়। কেননা পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। তবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আন্তরিক বলে জানা গেছে। অপরদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলার প্রতিই জোর দিচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদার করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তে মিয়ানমারের উসকানি সত্ত্বেও বাংলাদেশ যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক হেলিকপ্টার ১৭ বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল। গত ঈদের দিন মিয়ানমারের একটি সামরিক হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশসীমায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঢুকেছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ইতিমধ্যে বলেছেন, বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়াবে না। যুদ্ধ কোনো সমাধানও দেবে না। যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ধ্বংস হবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। এ চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে বাংলাদেশ অনেকখানি সফল হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীসহ আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই মিয়ানমারের গণহত্যার কড়া সমালোচনা করছে। পাশাপাশি, বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো মিয়ানমারের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরছে। এসব সমালোচনা সত্ত্বেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ করেনি। ফলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপসহ নানান ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই কার্যকর কিছু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নয়। ফলে বাংলাদেশের সরাসরি এ বিষয়ে ভূমিকা পালনের সুযোগ নেই। তবে বন্ধুরাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইস্যুটি নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ কারণেই ইস্যুটি নিরাপত্তা পরিষদে উঠছে। এই পরিষদে ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রয়েছে যার মধ্যে কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে কোনো প্রস্তাব পাস হবে না। নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এমন যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে তাতেও ভেটো দিতে পারে স্থায়ী সদস্যরা। গত বছরের অক্টোবরে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু হলে নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা হয়েছিল। তখন সদস্যদেশগুলো রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দেয়ার প্রস্তাব করলে চীন তাতে আপত্তি জানায়।

রাখাইন রাজ্যে বর্তমান সেনা অভিযান শুরুর পরও একবার নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে সেই আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকে সাহায্য কর্মীদের রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বানসংবলিত একটি বিবৃতি দেয়ার প্রস্তাবের ব্যাপারে চীনের আপত্তি ছিল। এ কারণে বিবৃতি দেয়া সম্ভব হয়নি। তারপর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হয়েছে। চীন বলেছে, এ বিষয়টি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে সুরাহা করুক সেটিই চীন চায়। তবে চীন গঠনমূলকভাবে নিজস্ব উপায়ে রোহিঙ্গা সংকটে সম্পৃক্ত আছে। রাশিয়াও একইভাবে ভেটো দিতে পারে বলে আশঙ্কা করায় রাশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশ যোগাযোগ করেছে। রাশিয়া এ বিষয়ে বাংলাদেশকে কোনো আশ্বাস দিয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

নিরাপত্তা পরিষদ ছাড়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ কম। নিরাপত্তা পরিষদ অবরোধ আরোপ ছাড়াও সহিংসতা বন্ধে শান্তিরক্ষী প্রেরণ করার ক্ষমতা রাখে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সনদে মিয়ানমার সই করেনি। ফলে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যায় যুক্ত জেনারেল ও রাজনৈতিক নেতাদের ওই আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে বিচারের সুযোগ নেই। তবে নিরাপত্তা পরিষদ তাদের বিচারে আইসিসিকে সুপারিশ করলে তা হতে পারে। এ ধরনের অনেক ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে। এসব কারণেই নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ না থাকলে কমপক্ষে মিয়ানমারের সহিংসতার নিন্দা ও তা বন্ধের আহ্বানসহ বিবৃতি দেয়া হলেও তা মিয়ানমারের ওপর চাপের সৃষ্টি করবে। এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন। তবে সাধারণ পরিষদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো ক্ষমতা নেই। সাধারণ পরিষদে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন করা যায়।

কক্সবাজারে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার কর্মকর্তা : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের নিন্দা জানানোর পরদিনই রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশে এসেছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সহকারী কমিশনার জর্জ ওকথ-ওবো। তিন দিনের সফরে মঙ্গলবার বিকালে ঢাকায় নেমেই ওকথ-ওবো অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইটে কক্সবাজারে রওনা হন বলে সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সফরের পুরোটা সময়ই সহকারী কমিশনার সেখানে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ঘুরে দেখবেন। বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফিরে তিনি এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলবেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে থাইল্যান্ড যাবেন; সেখানেও রোহিঙ্গা বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে জানান জোসেফ ত্রিপুরা।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top